• ভাত খাননি তিন দশক, চা-মুড়িই নন্দরানির সঞ্জীবনী
    এই সময় | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • রূপক সরকার, বালুরঘাট

    সন্তান দুধে-ভাতে থাকুক। এটাই ছিল ঈশ্বরী পাটনির প্রার্থিত বর। বাঙালির চিরন্তন এই আর্জির সঙ্গে নন্দরানি মহন্তর কোনও সম্পর্ক নেই। বালুরঘাটের এই বৃদ্ধা ৩৫ বছর ভাতই মুখে তোলেননি। লাল চা, মুড়ি ও পান খেয়ে দিব্যি আছেন। এর পিছনে রয়েছে এক মায়ের দীর্ঘ বিরহের গল্প। প্রায় ৩৫ বছর আগে নন্দরানির একমাত্র ছেলে পরিবার ছেড়ে বাংলাদেশে মামার বাড়ি চলে যান। বার বার বলেও ছেলেকে ফেরাতে পারেননি মা। সেই আঘাতেই ধীরে ধীরে খাওয়াদাওয়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন বৃদ্ধা। কমতে থাকে খাবারের পদ। এক সময়ে ভাত খাওয়াই ছেড়ে দেন।

    ডাঙা গ্রাম পঞ্চায়েতের মালঞ্চ আশ্রমপাড়ায় থাকেন নন্দরানি। বয়স ৭১ বছর। ভাত বর্জনের পরেও গোড়ার দিকে অল্পস্বল্প তরকারি বা অন্য পদ খেতেন তিনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই খাবারের তালিকাও ছোট হতে থাকে। এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ১০-১৫ গ্লাস চা এবং ১০-১২টি পানই নন্দরানির সঙ্গী। আগে দুধ-চা খেলেও এখন শারীরিক সমস্যার কারণে লিকার চা খান। চায়ের সঙ্গে এক মুঠো মুড়ি।

    এর মধ্যে বদলে গিয়েছে অনেক কিছু। বাংলাদেশ যাওয়ার পাঁচ বছর পরে ছেলে এ পারে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। বিয়ে করে সংসারও পাতেন। এখন হাঁড়ি আলাদা। ছেলে ফিরে এলেও অবশ্য বদলায়নি বৃদ্ধার ৩৫ বছরের অভ্যাস। বছর চারেক আগে স্বামী হরেন্দ্রনাথ মহন্তকে হারিয়েছেন নন্দরানি। এখন মেয়ে-জামাইয়ের পরিবারে থাকেন। বার্ধক্যের কারণে কোনও কাজ করতে পারেন না। সরকারি বিধবা ভাতাই ভরসা, সেটিও নিয়মিত পান না।

    নন্দরানি বলেন, 'ছেলে দেশ ছাড়ার পরে মনে কী হলো, ভাত খাওয়া ছেড়ে দিলাম। ইচ্ছে করত না। ছেলেটা বাড়ি ফিরলেও আর ভাত আমার পাতে ফেরেনি। অভ্যেস হয়ে গিয়েছে।' তাঁর মেয়ে ছবি মহন্তের কথায়ও উঠে আসে সেই পুরোনো আঘাতের কথা। তিনিবলেন, 'আমরা তিন বোন ও এক ভাই। মায়ের আদরের একমাত্র ছেলে বাংলাদেশে মামার বাড়ি চলে গিয়েছিল। মা অনেক বললেও ভাই তখন ফেরেনি। দুঃখে মা ভাত খাওয়া ছেড়ে দেন।'

    ছবির দাবি, দীর্ঘদিন স্বাভাবিক ডায়েটে না থাকার ফলে তাঁর মায়ের খাদ্যনালী শুকিয়ে ছোট হয়ে গিয়েছে। বলেন, 'এখন কিছু খাওয়ার চেষ্টা করলেও আর পারে না। পেটের সমস্যার কারণে দুধ চা খাওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মাঝেমধ্যে ডাক্তার দেখানো হয়।'

    বালুরঘাটের চিকিৎসক সৌরভ কুণ্ডু বলেন, 'দুধে ভিটামিন, প্রোটিন-সহ একাধিক পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এটি সুষম খাদ্য। অনেক ভিটামিন শরীরকে এনার্জি দেয়। এ ছাড়াও প্রোটিন-সহ অন্যান্য ভিটামিনের ঘাটতি মিটিয়ে দেয়। সাধু-সন্তরা দুধ, ঘি, মধু খেয়েই বছরের পর বছর বেঁচে রয়েছেন।' এমন খাদ্যাভ্যাসের কি বিরূপ প্রভাব নেই। চিকিৎসক বলেন, 'খাদ্যনালী শুকিয়ে যায় ধীরে ধীরে। পাচনতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যঙ্গ কাজ বন্ধ করে দেয়।'

    তবে এ সবের কোনও লক্ষণ এখনও টের পাননি নন্দরানি। তিনি ভালোই আছেন। তাঁর ছেলে ফিরে এসেছে, সংসারও হয়েছে। শুধু ফেরেনি মায়ের সেই ভাতের থালা। ৩৫ বছর পরেও লাল চায়ের কাপে মুড়ি আর ঠোঁটে পান নিয়েই কেটে যাচ্ছে বৃদ্ধার দিন। এর আড়ালে রয়ে গিয়েছে এক মায়ের মনোকষ্টের অতীত।

  • Link to this news (এই সময়)