• ‘একে অপরের শক্তি থেকে শিখতে পারে ভারত-চিন’, মোদী-জিনপিং বৈঠকে আলোচনায় কী কী?
    এই সময় | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • দীর্ঘ সাত বছর পরে ভারতে এলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দিল্লিতে চলতি ১৮তম BRICS সম্মেলনের ফাঁকে শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন তিনি। ভারত-চিন সম্পর্কের টানাপড়েন, সীমান্তে শান্তি, বাণিজ্য এবং দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা—বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, ‘ভারত ও চিন একে অপরের শক্তি থেকে শিখতে এবং পরস্পরকে সহযোগিতা করতে পারে।’

    দিল্লির ভারত মণ্ডপমে প্রায় ৫০ মিনিট ধরে চলে মোদী-শি বৈঠক। ২০২৫ সালের অগস্টে তিয়ানজিনে দুই রাষ্ট্রনেতার বৈঠকের পরে এটিই তাঁদের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, তিয়ানজিন বৈঠকের পর থেকে ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে, দুই নেতাই তা স্বাগত জানিয়েছেন। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পরে দুই দেশের সম্পর্কে যে দীর্ঘ টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, তার আবহে এই বৈঠককে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এদিনের বৈঠকে ৭ গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

    বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সীমান্ত সংক্রান্ত আগের চুক্তি ও বোঝাপড়াগুলি মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। দুই দেশই সীমান্ত সমস্যার একটি ‘ন্যায্য, যুক্তিসঙ্গত এবং পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য’ সমাধানের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

    ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী মোদী বৈঠকে জোর দিয়ে বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে থাকা মতপার্থক্য যেন কোনও ভাবেই বড় বিবাদে পরিণত না হয়।’ ভারত-চিন সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক সংবেদনশীলতা এবং পারস্পরিক স্বার্থ—এই তিনটি নীতির উপর জোর দেন।

    বৈঠকে ভারত-চিন বাণিজ্যের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য রেকর্ড ১৫৫.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছলেও, চিন থেকে ভারতের আমদানি ছিল প্রায় ১৩২ বিলিয়ন ডলার। ফলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

    দুই দেশই সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। একই সঙ্গে ভারত চিনের বাজারে আরও অর্থবহ ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকারের বিষয়টি তুলেছে।

    বাণিজ্যের পাশাপাশি ব্যবসায়িক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান এবং দুই দেশের মানুষের যাতায়াত আরও সহজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এর ফলে ভারত-চিনের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ফেরানোর প্রক্রিয়া আরও গতি পেতে পারে।

    শি জিনপিং জানান, ভারত ও চিনের মতো দুই বৃহৎ দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা প্রয়োজন। দুই দেশ একে অপরের শক্তি থেকে শিখে সহযোগিতা করতে পারে বলেও বার্তা দেন তিনি। শি উল্লেখ করেন, এখনও পর্যন্ত মোদীর সঙ্গে তাঁর ২১ বার বৈঠক হয়েছে। এই বৈঠকগুলিতে দুই নেতা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যে পৌঁছেছেন এবং তার ফলে ভারত-চিন সম্পর্ককে স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।

    ২০২০ সালের পূর্ব লাদাখের সংঘর্ষের পরে সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি কূটনৈতিক ও যোগাযোগের চ্যানেলও ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়েছে। তবে সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও হয়নি। তাই মোদী-শি বৈঠককে দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ককে পূর্ণ স্বাভাবিক করার দিকে ধাপে ধাপে এগোনোর প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

    শি বলেন, ‘ভারত ও চিন বিশ্বের দুই বৃহৎ জনবহুল দেশ এবং Global South-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বর্তমান বিশ্বে দ্রুত পরিবর্তনের পরিস্থিতিতে দুই দেশেরই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।’ মানবজাতির ভবিষ্যৎ এবং দুই দেশের মানুষের কল্যাণের কথা মাথায় রেখে ভারত ও চিনকে একসঙ্গে কাজ করার বার্তা দেন তিনি। তাঁর মতে, ‘দুই দেশ নিজেদের শক্তি থেকে শিখে পরস্পরকে সহযোগিতা করলে বৃহত্তর উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।’

    বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রী মোদী সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তিনি ভারত-চিন সম্পর্কের ‘সম্পূর্ণ পরিসর’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে আগামী বছর চিনের BRICS সভাপতিত্ব শুরু হতে চলায় চিনকে শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন তিনি।

    সব মিলিয়ে, সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানো—এই দুই স্তম্ভের উপর ভারত-চিন সম্পর্ককে নতুন করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে মোদী-শি বৈঠকে। তবে বাণিজ্য ঘাটতি এবং সীমান্ত বিরোধের মতো জটিল বিষয়গুলি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

  • Link to this news (এই সময়)