এই সময়: বৃহস্পতিবারের পর শুক্রবারও। পূর্ব বর্ধমানের শেখ সায়দুল হক ও উত্তর ২৪ পরগনার জ়ুলফিকার মণ্ডলের পরে স্ক্যানারে আরও তিন ভুয়ো ডাক্তার। তাঁরাও সায়দুল-জ়ুলফিকারের মতো বিহারের ফেক সার্টিফিকেট দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল (ডবলিউবিএমসি) থেকে ডাক্তারির রেজিস্ট্রেশন বাগিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। এ তথ্য খোদ বিহার কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশনের (বিসিএমআর) পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অভিযোগ, এঁদের মধ্যে রয়েছেন সরকারি চিকিৎসকও। তিন জনই দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ডাক্তারি করেন। দু’জন রাজপুর-সোনারপুর পুর ক্লিনিকে চাকরি করেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় শুক্রবার বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন ও হাসপাতাল সংগঠনের তরফে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করে চিঠি দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়কে।
অভিযোগ— তিন জনেই বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভুয়ো শংসাপত্র দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিয়ে ডাক্তারি করছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই পর পর দু’দিন ভুয়ো ডাক্তারের কথা প্রকাশ্যে আসায় রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তবে সায়দুল ও জ়ুলফিকারের মতো বিহারের অভিন্ন রেজিস্ট্রেশন নম্বর (৩৬৪৪২) ব্যবহার করে ডবলিইবিএমসি-তে আবেদন করেননি এই তিন জন। কিন্তু বিহারের যে তিনটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর (৪৮৫৩৩, ৪০৪৭৭ ও ৪৫৭৮১) উল্লেখ করেছিলেন ওই তিন চিকিৎসক, শুক্রবার সেগুলিকে দ্বর্থ্যহীন ভাষায় ভুয়ো বলে দাবি করে বিসিএমআর জবাবি মেল পাঠিয়েছে অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিংহোম (এপিএইচএন)-এর সম্পাদক রাজীব পাণ্ডেকে।
রাজীব জানান, তাঁদের নবগঠিত সংগঠনের মধ্যে যাতে বেনোজল ঢুকে না পড়ে, সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন জেলায় কমিটি তৈরি করতে গিয়ে তাঁরা ডজনখানেক ‘কীর্তিমান’-এর সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রথমে সায়দুল ও জ়ুলফিকার এবং পরে আরও তিন জন সরকারি চিকিৎসকের ডাক্তারি রেজিস্ট্রেশন যে আসলে ভুয়ো, সে সম্পর্কে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করার পরে তা স্বাস্থ্য দপ্তর ও ডবলিউবিএমসি-তে জমা দিয়েছেন তাঁরা। চিঠি লিখেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীকেও। অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানানোর পাশাপাশি তৃণমূল জমানায় ডবলিউবিএমসি-র মাথায় থাকা কর্তাদের অপসারণ ও সাসপেনশন দাবিও করা হয়েছে সংগঠনের তরফে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে এপিএইচএন-এর অভিযোগ— ভিন রাজ্য থেকে জাল এমবিবিএস ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির নথি জোগাড় করে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার একটি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। যার নেপথ্যে থাকতে পারে বেআইনি আর্থিক লেনদেনও। সরকারি চিকিৎসকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অফ হেলথ সার্ভিস ডক্টর্সের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মানস গুমটা বলেন, ‘অবিলম্বে সর্বোচ্চ স্তরের তদন্ত চাই! ভাবাই যাচ্ছে না, মেডিক্যাল কাউন্সিলের দুর্নীতি কোন পর্যায়ে যেতে পারে! মানুষের জীবন নিয়ে এ ভাবে যারা ছিনিমিনি খেলছে বা খেলেছে, তাদের ঠান্ডা ঘর থেকে বের করে জেলে ভরতে হবে।’
একই সুর আর এক চিকিৎসক সংগঠন ওয়েস্টবেঙ্গল ডক্টর্স ফোরামের সভাপতি কৌশিক চাকীর গলায়। তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগ সত্যি হলে, তা নিছক প্রশাসনিক ভুল নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অপরাধ।’ তিনি মনে করেন, রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার আগে আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পূর্ববর্তী রেজিস্ট্রেশন যাচাই করা কাউন্সিলে মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে এমন মারাত্মক ব্যর্থতার জন্য বর্তমান সভাপতি, বর্তমান ও তার আগের কাউন্সিল ও সংশ্লিষ্ট কার্যনির্বাহী সদস্যরা কেউ দায় এড়াতে পারেন না।
সরকারি চিকিৎসকদের আর এক সংগঠন সার্ভিস ডক্টর্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সজল বিশ্বাস বলেন, ‘চিকিৎসার ক্ষেত্রে জাল বা অবৈধ রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিয়ে কেউ যদি চিকিৎসা করে থাকেন, এর চেয়ে ভয়ঙ্করতম অপরাধ আর কিছু হতে পারে না। এর ফলে বহু মানুষের জীবনহানির আশঙ্কাও রয়েছে, যা চিকিৎসা জগতেরও জন্যও চূড়ান্ত অবমাননা।’ এক স্বাস্থ্যকর্তা বলেন, ‘পুরোটাই তদন্তের আওতায় রয়েছে।’