এই সময়: বৃষ্টির প্রাবল্য বাংলায় এ বার রীতিমতো বিরক্তির কারণ হতে চলেছে। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ অংশেই পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির পথে। গতি হারিয়ে ফের আবহবিদদের চিন্তায় ফেলেছে দক্ষিণ–পশ্চিম পশ্চিম মৌসুমি বায়ু। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রকাশিত কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দপ্তরের (আইএমডি) রিপোর্ট বলছে, ১ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে বৃষ্টি হয়েছে ৪৪.৩ মিলিমিটার। এই সময়ে স্বাভাবিক বৃষ্টির পরিমাণ থাকে ৫৯.৯ মিলিমিটার। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশে। একই সঙ্গে ১ জুন থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট বৃষ্টির পরিমাণ ৬৪৮ মিলিমিটার, যেখানে স্বাভাবিক বৃষ্টি ৭৬০.৬ মিলিমিটার। অর্থাৎ গোটা বর্ষা মরশুমে এখনও পর্যন্ত ঘাটতি ১৫ শতাংশ। অগস্টের শেষে এই ঘাটতি ছিল ১৪ শতাংশ। সুতরাং, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘাটতি বাড়ছে, তা বলাই যায়।
বর্ষার শেষ পর্বে এমন ঘাটতি দেশের বেশির ভাগ অংশেই কৃষি, জলসম্পদ এবং খাদ্যের মূল্যের উপরে নতুন চাপ তৈরি করছে। বিশেষত খরিফ শস্যের ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বরের বৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধান, তুলো, সয়াবিন, ভুট্টা, ডাল ও তৈলবীজের মতো ফসল এখন বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা না থাকলে ফলন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা পুরোমাত্রায়। কম বৃষ্টি শীতকালীন রবি চাষের আগে মাটির আর্দ্রতার উপরেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা কৃষিবিজ্ঞানীদের।
রাজস্থান, বিহার ও ছত্তিসগড়ের মতো একাধিক কৃষিপ্রধান রাজ্যে বৃষ্টির ঘাটতি রয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশের পরিস্থিতি বিশেষ ভাবে উদ্বেগজনক। সেপ্টেম্বরের প্রথম ন’দিনে অন্ধ্রপ্রদেশের পাশাপাশি তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্নাটক, তেলঙ্গানা ও ছত্তিসগড়ের একাধিক এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক জেলাতেই গড়ের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়েছে। ফলে জলাধারে জলের জোগান এবং সেচের জল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
আকাশের ছবিতেও বর্ষার দুর্বলতার ইঙ্গিত মিলেছে। ১০ সেপ্টেম্বরের উপগ্রহচিত্রে দেখা গিয়েছে দেশের পশ্চিম, মধ্য ও উত্তরাংশের বিস্তীর্ণ এলাকায় মেঘের আচ্ছাদন তুলনামূলক ভাবে পাতলা। বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় নিম্নচাপের প্রভাবে অবশ্য সক্রিয় মেঘপুঞ্জ রয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে নতুন করে একটি নিম্নচাপ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে এবং ওডিশা ও ছত্তিসগড়ে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। অর্থাৎ, বিচ্ছিন্ন ভাবে প্রবল বৃষ্টি হলেও তার সুফল গোটা দেশের ঘাটতি মেটাতে পারবে না বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জলাধারের পরিস্থিতিও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্ষার বৃষ্টির উপরে নির্ভর করে দেশের বহু বড় জলাধারে জল সঞ্চয় হয়, যা পরে সেচ, পানীয় জল এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টির ঘাটতি থাকলে সেই সঞ্চয়ে চাপ বাড়তে পারে। বিশেষত যে সব রাজ্যে খরিফ চাষের পাশাপাশি আসন্ন রবি চাষের জন্য সেচের প্রয়োজন বেশি, সেখানে জলের ব্যবস্থা করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে বাকি মরশুমে বৃষ্টির পরিমাণের পাশাপাশি তার ভৌগোলিক বণ্টনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্ষা এখনও পুরোপুরি বিদায় নেয়নি। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন করে কোনও নিম্নচাপ বা সক্রিয় মৌসুমি ব্যবস্থা তৈরি হলে কিছুটা ঘাটতি পূরণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাই শেষ লগ্নে বর্ষা কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, এখন নজর সে দিকেই।