এই সময়: আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যে ভারতীয় সংস্কৃতি এবং পরম্পরার কোনও বিরোধ নেই— সেই বার্তা বিভিন্ন সময়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী–সহ বিজেপির শীর্ষ নেতা–নেত্রীরা। শুক্রবার যেন তারই প্রতিধ্বনি শোনা গেল বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর গলায়। তিনি চান, আধুনিক শিক্ষা এবং ভারতীয় পরম্পরা হাত ধরাধরি করে চলুক।
শুক্রবার কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে কবি কুমার বিশ্বাসের ‘রাম কথা’ অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, নতুন প্রজন্মকে যেমন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে, তেমনই হনুমান চালিশার প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে। এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা অবশ্যই চাই। কিন্তু তার সঙ্গে গীতাপাঠ, হনুমান চালিশা পাঠ, টিকা লাগানো, তুলসী–মাকে জলদানের মতো আমাদের যে পরম্পরাগুলি আছে, পড়ুয়াদের ভিতরে তার জাগরণ ঘটানোর আহ্বান জানাচ্ছি।’
নিছক আহ্বান জানিয়েই নিজের দায়িত্ব সারছেন না মুখ্যমন্ত্রী। পরম্পরা রক্ষা করার ক্ষেত্রে তিনি নিজেও কতটা তৎপর, তা–ও এ দিন নেতাজি ইন্ডোরের অনুষ্ঠান থেকে জানিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর ঘোষণা, ‘নভেম্বর মাসে হনুমান চালিশা পাঠের বড় কর্মসূচি হবে কলকাতায়। ডিসেম্বরে ব্রিগেডে পাঁচ লাখ কণ্ঠে গীতা পাঠ হবে। এ বার গঙ্গাসাগর মেলা আন্তর্জাতিক হবে।’ মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘এ বছর রাজ্যে আরও বড় করে দুর্গাপুজো হবে। আমাদের পরম্পরা রক্ষা করেই সামনের দিকে এগোতে হবে।’ তাঁর আক্ষেপ, ‘কলকাতা দেশের কালচারাল রাজধানী ছিল। ৩৪ বছর কমিউনিস্টরা আর ১৫ বছর তৃণমূল সরকার সেটা ধ্বংস করেছে।’
ভারতীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী চাইছেন, নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতে। সেই লক্ষ্যে তিনি উল্লেখ করেন রাজ্যের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ চালু করার কথা। শুভেন্দুর কথায়, ‘মাদ্রাসায় বন্দে মাতরম চালু করেছি। যারা বন্দে মাতরম বলবে, তাদের সঙ্গে সরকার আছে। না বললে কী করতে হবে, আমি জানি। পরবর্তী প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।’
মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর থেকেই শুভেন্দু বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর জমানায় বাংলায় সাধু–সন্তদের গুরুত্ব বাড়তে চলেছে। বইমেলার উপদেষ্টা কমিটি থেকে রাস্তার নামকরণ কমিটি— সর্বত্রই তিনি সাধু–সন্তদের রেখেছেন। সম্প্রতি হাওড়ার লিলুয়ায় ‘বাগেশ্বর বাবা’র (ধীরেন্দ্রনাথ শাস্ত্রী) অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন তিনি। এ দিন মুখ্যমন্ত্রীকে নেতাজি ইন্ডোরে দেখা গেল কবি কুমার বিশ্বাসের ‘রাম কথা’ অনুষ্ঠানে। আগামী জানুয়ারিতে বাংলায় আসছেন আধ্যাত্মিক গুরু রামভদ্রচারিয়া। তাঁর একটি বড় যজ্ঞ করারও পরিকল্পনা আছে। অতীতে বাম জমানায় এবং গত ১৫ বছর তৃণমূল জমানায় এই সাধু–সন্তরা বাংলায় উপেক্ষিত হয়েছেন— এই অভিযোগ পদ্ম শিবিরের তরফে বারবার তোলা হয়েছে। ক্ষমতায় এসে সাধু–সন্ন্যাসীদের সেই সম্মান ফিরিয়ে দিতে চাইছে বিজেপি।
সম্প্রতি বাগেশ্বর বাবার আমিষ মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ওই সাধুর গ্রেপ্তারির দাবিতে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর থানার সামনে বাগেশ্বর বাবার ছবিতে আগুন ধরিয়ে বিক্ষোভ দেখান কংগ্রেস নেতা–কর্মীরা। বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে সাফ জানিয়ে দেন, যাঁরা বাগেশ্বর বাবার ছবিতে আগুন দিয়েছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মতো বৃহস্পতিবার রাতেই বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অতনু দাসকে। এই ‘অগণতান্ত্রিক’ গ্রেপ্তারির নিন্দা করেছে কংগ্রেস। বিষয়টিকে ‘ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। তবে কংগ্রেস নেতা গ্রেপ্তারির ঘটনা থেকে স্পষ্ট, সাধু–সন্তদের অপমান কিছুতেই বরদাস্ত করবে না শুভেন্দু অধিকারীর নেতত্বাধীন বিজেপি সরকার।
এ দিন আবার স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো থেকে তাঁর সেই মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাগেশ্বর বাবা। তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষের হয়তো আমার কথা পছন্দ হয়নি। তবে একজন ধর্মগুরু হিসেবে আমি বলিপ্রথার বিরোধিতা করেছিলাম। আমি শুধু এটাই বলতে চেয়েছিলাম— যদি কেউ আমিষ খেয়েও থাকেন, দয়া করে মায়ের মণ্ডপের কাছে তা খাবেন না।’ সুর কিছুটা নরম করলেও, পশুবলির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানে অনড় থেকেই তিনি বলেন, ‘শিব প্রতিটি জীবের মধ্যেই বিরাজমান। শাস্ত্র কী বলে, তা নিয়ে আমাদের আলোচনা করা উচিত। পশুবলির বিরুদ্ধে আমি আওয়াজ তুলেছি এবং আগামী দিনেও তুলব।’