• মনতোষের ট্যাকলে ফিরে এলেন দীপক মণ্ডল, স্লাইডিং ট্যাকলের সেই পুরনো নেশা নতুন নায়কের পায়ে
    আজকাল | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডার্বি মানেই শুধু ৯০ মিনিটের ফুটবল নয়। ডার্বি মানে আবেগ, ইতিহাস, প্রত্যাশা, আর কখনও কখনও এমন একটি মুহূর্ত, যা ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও থেকে যায়। কখনও তা একটা গোল, কখনও একটা সেভ,আবার কখনও তা একটা দুর্দান্ত ট্যাকল। যা স্মৃতিতে থেকে যায় চিরকাল। সোমবারের কলকাতা লিগের ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্ডার মনতোষ চাকলাদারের সেই ট্যাকলটাও তেমনই এক মুহূর্ত।

    মোহনবাগানের তারকা মনবীর সিং বল নিয়ে ঢুকে পড়েছেন ইস্টবেঙ্গলের পেনাল্টি বক্সের ভিতরে। প্রথমার্ধে এই মনবীরই ইস্টবেঙ্গলের জালে বল জড়িয়েছেন। পাঞ্জাবতনয়ের সামনে গোলের সুযোগ। আর ঠিক সেই সময়েই ঝাঁপিয়ে পড়লেন মনতোষ। নিখুঁত টাইমিংয়ে এবং স্লাইডিং ট্যাকলে বল বিপন্মুক্ত করলেন। বর্ষা ভেজা মাঠে ওরকম স্লাইডিং ট্যাকল করতে কলজের জোর লাগে। লাগে আত্মবিশ্বাস। ঠিকঠাক ট্যাকল না হলেই সর্বনাশ...। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্ডার মনতোষ সাহসের পরিচয় দিলেন। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান ডিফেন্ডার দলকে বাঁচিয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুড়লেন শূন্যে।

    একজন ডিফেন্ডারের কাজটা অনেক সময় এমনই। নিজের নামটা স্কোরলাইনে ওঠে না, কিন্তু একটা মুহূর্তে পুরো দলকে বাঁচিয়ে দেয়। মনতোষ সোমবার সেটাই করেছিলেন। তাঁর ওই ট্যাকলের গল্প অবশ্য শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে, কোনও বড় স্টেডিয়ামে নয়। পাড়ার মাঠে।

    জাতীয় দলের প্রাক্তন তারকা ডিফেন্ডার দীপক মণ্ডলের খেলা বিশেষভাবে আকর্ষণ করত মনতোষকে। বিশেষ করে দীপকের স্লাইডিং ট্যাকল। অগ্রজ দীপকের খেলা দেখতে দেখতেই স্বপ্ন দেখতেন এরকম স্লাইডিং ট্যাকল তিনিও করবেন। সেই ট্যাকলই পরে পাড়ার মাঠে নিজের মতো করে করার চেষ্টা করেন।

    সময়ের সঙ্গে পাড়ার মাঠ পেরিয়ে মনতোষ পৌঁছে গিয়েছেন এক মহাসমুদ্রে। তাঁর পিঠে এখন ইস্টবেঙ্গলের জার্সি। লাল-হলুদের রক্ষণ আগলানোর দায়িত্বে তিনি। ম্যাচে নামার আগে মতি নন্দীর স্টপারের মতো মনে মনে হয়তো তিনি বলেন, ''মনো ব্যালান্স হারালে চলবে না।'' স্টপারের ব্যালান্সটাই তো আসল। কলকাতা ডার্বিতে মনবীরের পা থেকে বল বের করে দেওয়া সেই স্লাইডিং ট্যাকল ফিরিয়ে আনল দীপক মণ্ডলের স্মৃতি।

    কখনও কখনও ওই ট্যাকল দেখার জন্যই মাইলের পর মাইল ছুটে আসা যায়। রেফারির শেষ বাঁশির পরে সেই ট্যাকলের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরা যায়। তাই ডার্বি হয়ে গেলেও মনতোষের ওই ট্যাকল নিয়ে জোর চর্চা। কীভাবে এমন আত্মবিশ্বাসী ট্যাকল করা সম্ভব?

    এই আত্মবিশ্বাসের বীজ ডার্বির আগে মনতোষদের ভিতরে বুনে দিয়েছিলেন সিনিয়র দলের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস। অভিজ্ঞ কোচ বলেছিলেন, ''এই ছেলেরা ইস্টবেঙ্গলকে সুপার সিক্সে পৌঁছে দিয়েছে। ওরাই মোহনবাগানের মোকাবিলা করতে পারবে।''

    প্রতিপক্ষে রয়েছেন সাহাল, মনবীর, আপুইয়া, রাহুল ভেকে, মেহতাব সিং, কিয়ান নাসিরির মতো আইএসএল খেলা দামি তারকা। কিন্তু অকুতোভয় মনতোষরা বাগান তারকাদের দেখিয়ে দিলেন, তাঁরাও পারেন নৌকাডুবি ঘটাতে। ম্যাচ ড্র হলেও, এই ড্র যে জয়ের সমান। বারাসতে বৃষ্টি ভেজা সবুজ ঘাসে লড়াই, লড়াই আর লড়াইয়ের রূপকথা লিখে গেল ইস্টবেঙ্গল। মনতোষের ট্যাকল সেই লড়াইয়েরই একটা ছবি। তবে ডার্বির গল্পটা শুধু মাঠে শেষ হয়নি।

    ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে ছিল অন্যরকম এক আনন্দ। সাধারণত ক্লাবের ম্যাচ-পরবর্তী টিফিনে থাকে পাউরুটি, স্যান্ডউইচ, ডিম, কলা, আপেলের মতো সাধারণ খাবার। কিন্তু ডার্বির রাতটা তো আর সাধারণ রাত নয়। তাই ড্রেসিংরুম থেকেই উঠেছিল বিরিয়ানির আবদার।

    শেষ পর্যন্ত এল মাটন বিরিয়ানি। সেই মাটন বিরিয়ানি বাড়িতে নিয়ে গিয়েই ডিনার সারেন লাল-হলুদ ডিফেন্ডার। ম্যাচের পর তাঁদের জন্য নেই কোনও বিলাসবহুল গাড়ি, নেই বিলাসবহুল লাইফস্টাইল। ডার্বির অন্যতম নায়ককে ফিরতে হল নিজের চেনা পথেই।

    বারাসত থেকে এক সতীর্থ বাইকে করে মনতোষকে পৌঁছে দিলেন বারাসত স্টেশনে। সেখান থেকে ট্রেনে নৈহাটি। নৈহাটি থেকে খেয়া পেরিয়ে চুঁচুড়া। বাড়ি ফিরলেন যখন, তখন রাত সাড়ে দশটা। কয়েক ঘণ্টা আগেই যে ছেলেটা ডার্বির মাঠে হাজার হাজার চোখের সামনে ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ সামলাচ্ছিলেন, সেই ফুটবলারই ট্রেনে-খেয়া করে বাড়ি ফিরছেন রাতে। মাঠে স্বপ্নের ফুটবল। মাঠের বাইরে সাধারণ জীবন।

    আর এই সাধারণ জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরও বড় একটা প্রশ্ন, কলকাতা লিগের পর কী? মনতোষের ডার্বির রাত তাই শুধু একটা দুর্দান্ত ট্যাকলের আখ্যান নয়। অনেক কিছু ভাবনারও এক রাত।

    সোমবারের ডার্বি একটা কথা বলে গেল, সুযোগ পেলে মনতোষরা লড়তে জানেন। বড় নামের সামনে মাথা নত করতে জানেন না। উল্টে বড় তারকারা কুর্নিশ জানান তাঁদের লড়াইকে, তাঁদের উদ্যমকে।

    কখনও কখনও একটা নিখুঁত ট্যাকলই হয়ে ওঠে একজন ফুটবলারের পরিচয়। এমন এক মুহূর্ত, যার রেশ ম্যাচের শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে ফুরিয়ে যায় না। সময় পেরিয়ে যায়, ম্যাচের ফল পুরনো হয়ে যায়, মাঠের ঘাস বদলে যায়, তবু সেই ট্যাকল থেকে যায় স্মৃতিতে। বহু বছর পরেও যার কথা মনে পড়লে মনে হবে, এমন কিছু মুহূর্তের জন্যই তো ফুটবল এত সুন্দর।
  • Link to this news (আজকাল)