নেই আধার কার্ড, বৃদ্ধাকে ভর্তি নিল না হাসপাতাল; বাড়ি ফেরার পথেই মৃত্যু
eTV Bharat | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বনগাঁ, 7 সেপ্টেম্বর: সঙ্গে আধার কার্ড ছিল না। অসুস্থ বৃদ্ধাকে ফিরিয়ে দিল হাসপাতাল। আধার কার্ড আনতে বাড়িতে ফিরছিলেন। হাসপাতালের বাইরেই মাথা ঘুরে পড়ে মৃত্যু হল অসুস্থ বৃদ্ধার। এমনই দাবি পরিবারের । সোমবার সন্ধ্যায় চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর 24 পরগনার বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে।
হাসপাতালের সুপার কৃষ্ণচন্দ্র বড়াই শারীরিক অসুস্থতার কারণে ছুটিতে রয়েছেন। ঘটনা সম্পর্কে জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তা সম্ভব হয়নি । কর্তব্যরত চিকিৎসক গৌরী মন্ডল জানান, বৃদ্ধাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেছিলেন । কিন্তু কেন তাঁকে ভর্তি নেওয়া হয়নি তা বলতে পারবেন না । হাসপাতালের তরফে আর কেউ কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই বৃদ্ধের নাম রেনু সরকার। বয়স 60 বছর। বাড়ি বনগাঁর পেট্রাপোল থানার কালিয়ানি খেদাপাড়ায়। বেশ কয়েক বছর আগে স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। ওই বৃদ্ধার কোনও সন্তান নেই। বাড়িতে তিনি একাই থাকতেন। গত কয়েকদিন ধরে বুকের ব্যথায় ভুগছিলেন। বাড়িতে তিনি ব্যক্তিগত চিকিৎসকের দেওয়া প্রেসক্রিপশনের ওষুধ খাচ্ছিলেন। ওষুধ খাওয়ার পর কিছুটা ব্যথা কম ছিল। আবার পরে তা বেড়ে যাচ্ছিল।
সোমবার বিকেলের পর থেকে বুকের ব্যথা তাঁর আরও বাড়তে থাকে। খবর পেয়ে পাশের গ্রাম থেকে বোন সরস্বতী সরকার তাঁকে দেখতে আসেন। দিদির শারীরিক অবস্থা ভালো নয় দেখে সন্ধ্যার পরে তিনি তাঁকে বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের চিকিৎসক প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। কর্তব্যরত চিকিৎসকে তাঁকে উপরের তলায় বেডে ভর্তির জন্য পাঠিয়ে দেন।
ভর্তির নথিপত্র তৈরি সময় স্বাস্থ্যকর্মীরা রেনু দেবীর আধার কার্ড চান। তাড়াহুড়োর কারণে তিনি আধার কার্ড সঙ্গে নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। তখন ওই বৃদ্ধাকে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সরা সাফ জানিয়ে দেন, আধার কার্ড ছাড়া রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা যাবে না। রেনু তখন বুকের ব্যথায় ছটফট করছেন। তাঁর বোন সরস্বতী চিকিৎসককে অনুরোধ করেন, 'আপনারা চিকিৎসা শুরু করুন। আমি বাড়ি গিয়ে আধার কার্ড এনে দেব।' কিন্তু চিকিৎসকে ও নার্সরা জানিয়ে দেন, আধার কার্ড ছাড়া কোনওমতেই ভর্তি করা যাবে না। ওই বৃদ্ধার চিকিৎসাও শুরু করা যাবে না।
বুকে অসহ্য ব্যথা থাকলেও বোনকে নিয়ে আধার কার্ড আনতে তিনি হাসপাতাল থেকে আবার বাড়ি ফিরছিলেন। তখন বুকের ব্যথা আরও বেড়ে যায়। তিনি হাসপাতালের গেটের সামনেই মাথা ঘুরে রাস্তার উপরেই পড়ে যান। কিছুক্ষণ ছটফট করার পর তাঁর দেহ নিথর হয়ে যায়। সরস্বতী তখন দিদিকে ফের ওই বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তখন চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে ওই বৃদ্ধাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের অভিযোগ
মৃতার বোন সরস্বতী বলেন, 'আমি হাসপাতালে অনেকদিন যাইনি। হাসপাতলে ভর্তির সময় আধার কার্ড নিতে হবে, এই সব নিয়ম আমার জানা ছিল না। দিদি অসহ্য বুকে ব্যথায় ছটফট করছিল। কিন্তু আধার কার্ড নিইনি বলে চিকিৎসকরা দিদিকে হাসপাতালে ভর্তি নেননি। আধার কার্ড নিতে আমরা আবার বাড়ি ফিরছিলাম। হাসপাতালের গেটের সামনে বুকের ব্যথা ছটফট করতে করতে দিদি রাস্তার উপরে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। পরে আবার হাসপাতালে নিয়ে যাই। তখন চিকিৎসকেরা জানান, দিদির মৃত্যু হয়েছে।'
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক গৌরী মন্ডল বলেন, "ওই বৃদ্ধাকে ভর্তি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই মতো তাঁকে বেডে দেওয়ার জন্য উপরের তলায় পাঠানো হয়েছিল। সেখানে কেন তাঁকে ভর্তি নেয়নি, তা বলতে পারব না। রোগীর সঙ্গে আধার কার্ড না থাকলেও চিকিৎসা শুরু করারই নিয়ম। আধার কার্ড পরে দিলেও চলবে। কিন্তু কেন ওই বৃদ্ধাকে ভর্তি না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হল আমি তা জানি না। বিষয়টি খোঁজখবর নেওয়া হবে।"
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বনগাঁ থানার পুলিশ। আধার কার্ডের জন্য কেন একজন বৃদ্ধাকে জরুরি চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হল, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশও ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।