কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
বর্ষা নামলেই বাতাস ধুয়ে-মুছে দূষণ কমবে — সাধারণত এমনটাই ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু এ বছর ছবিটা তেমন নয়। বর্ষার ভরা মরশুমেও দেশের ২৫৮টি শহরের ২১৫টির বাতাসেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র নির্ধারিত দৈনিক নির্দেশিকার চেয়ে বেশি পরিমাণে সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পিএম২.৫-এর উপস্থিতি ধরা পড়েছে। যদিও ভারতের জাতীয় বায়ুমান মানদণ্ডের বিচারে ছবিটা তুলনামূলক ভাবে স্বস্তিদায়ক। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কির 'সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার' (সিআরইএ)-এর সম্প্রতি প্রকাশিত অগস্টের রিপোর্টেই উঠে এসেছে এই বৈপরীত্য।
জাতীয় মানদণ্ডে স্বস্তি, হু-র বিচারে নয় ভারতের ২৫৮টি শহরের মধ্যে ২১৫টি, অর্থাৎ ৮৩ শতাংশর বেশি শহরের বাতাসকেই 'বিপজ্জনক' বলে রিপোর্ট দিচ্ছে 'হু'। অগস্টে ভারতের এই শহরগুলিতে ২৪ দিনের অর্থাৎ ৮০ শতাংশ দিনের নিরবচ্ছিন্ন বায়ুমান পর্যবেক্ষণের তথ্য পাওয়া গিয়েছে। দেখা গিয়েছে, ওই শহরগুলিতে পিএম২.৫-এর মাত্রা ভারতের জাতীয় পরিবেশগত বায়ুমান মানদণ্ড বা 'ন্যাশনাল অ্যাম্বিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড' (এনএএকিউএস)-এর বেঁধে দেওয়া দৈনিক প্রতি ঘনমিটারে ৬০ মাইক্রোগ্রামের 'নিরাপদ সীমা'–র নীচেই ছিল। কিন্তু হু-র নির্দেশিকা আরও কঠোর। সেখানে দৈনিক পিএম২.৫-এর নির্দেশিত মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম। রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, দেশের মাত্র ৪৩টি শহর এই সীমার মধ্যে ছিল। অর্থাৎ, ভারতীয় মাপকাঠিতে অধিকাংশ শহর স্বস্তিদায়ক জায়গায় থাকলেও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য-নির্দেশিকার তুলনায় ছবিটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞদের কাছে পিএম২.৫ নিয়ে উদ্বেগের কারণ অমূলক নয়। অতি সূক্ষ্ম এই ভাসমান কণা সহজেই ফুসফুসের গভীরে পৌঁছতে পারে। এর সঙ্গে অন্য ক্ষতিকর দূষকও শরীরে প্রবেশ করার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘদিন এমন দূষিত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে বিভিন্ন গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে।
উত্তর থেকে দক্ষিণ, বর্ষাতেও 'স্পাইক' সিআরইএ-র রিপোর্টে আরও উল্লেখযোগ্য বিষয়, বর্ষার মধ্যেও দেশের উত্তর ও দক্ষিণের কয়েকটি এলাকায় পিএম২.৫-এর মাত্রায় হঠাৎ বৃদ্ধি বা 'স্পাইক' দেখা গিয়েছে। হরিয়ানার চরখি দাদরি অগস্টে দেশের সবচেয়ে দূষিত শহর হিসেবে উঠে এসেছে। সেখানে মাসিক গড় পিএম২.৫-এর মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৮ মাইক্রোগ্রাম। মাসের ৩১ দিনের মধ্যে ১৮ দিনই সেখানে দূষণের মাত্রা ভারতীয় দৈনিক সীমা ছাড়িয়েছিল।
দূষণের নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে ছিল তামিলনাড়ুর গুম্মিডিপুন্ডি। সেখানে মাসিক গড় পিএম২.৫ ছিল ঘনমিটারে ৬২ মাইক্রোগ্রাম। হরিয়ানা, তামিলনাড়ু ও রাজস্থানের মোট তিনটি শহর ভারতীয় মানদণ্ডে 'মাঝারি' দূষণের শ্রেণিতে পড়েছে। বাকি শহরগুলির বেশিরভাগই ছিল 'ভালো' বা 'সন্তোষজনক' শ্রেণিতে।
তবে একই রিপোর্টে স্বস্তির ছবিও রয়েছে। মহারাষ্ট্রের ডোম্বিভলি অগস্টে দেশের সবচেয়ে পরিষ্কার শহর হিসেবে উঠে এসেছে। সেখানে মাসিক গড় পিএম২.৫–র পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারে মাত্র পাঁচ মাইক্রোগ্রাম। ছত্তিসগড়ের কুঞ্জেমুরা প্রতি ঘনমিটারে সাত মাইক্রোগ্রাম পিএম২.৫ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে।
মহানগরগুলির মধ্যে দিল্লিতে মাসিক গড় পিএম২.৫ ছিল ৩৫, কলকাতায় ২৩, চেন্নাইয়ে ২০ এবং বেঙ্গালুরুতে ১৯ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার। মুম্বইয়ে তা আরও কম —১৪।
তবে সিআরইএ-র রিপোর্টের আরও বড় বার্তা, দেশের ৮৯টি 'ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম' (এনসিএপি)-এর শহরের একটিও ভারতীয় দৈনিক মানদণ্ড অতিক্রম করেনি। অথচ ওই ৮৯টির মধ্যে ৭৫টি শহরই হু-র দৈনিক নির্দেশিত মাত্রা ছাড়িয়েছে। এনসিএপি-র বাইরে থাকা ১৬৯টি শহরের মধ্যে ১৪০টির পিএম২.৫ মাত্রা হু-র সীমার বেশি।
ফলে বর্ষার বৃষ্টিতে দূষণ সাময়িক ভাবে কমলেও বাতাসের স্বাস্থ্যঝুঁকি যে পুরোমাত্রায় বর্তমান, অগস্টের পরিসংখ্যানেই তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।