ডার্বির উত্তেজনার মাঝেই ময়দানে শোকের ছায়া, প্রয়াত তিন প্রধানে খেলা বাংলার ফুটবলার
এই সময় | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কলকাতা ডার্বি মানেই আবেগ, ইতিহাস আর অগণিত স্মৃতির সমাহার। লাল-হলুদ ও সবুজ-মেরুন সমর্থকদের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়ই ময়দানে নেমে এল শোকের ছায়া। প্রয়াত হলেন কলকাতার তিন প্রধান— ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান এবং মহামেডান স্পোর্টিংয়ের প্রাক্তন ফুটবলার আমজ়াদ আলি খান। এক সময় যিনি ময়দানের পরিচিত মুখ ছিলেন, যাঁর লড়াই, পরিশ্রম এবং ফুটবলের প্রতি নিবেদন তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছিল, সেই আমজ়াদ আর নেই।
তাঁর মৃত্যুতে কলকাতার ফুটবল মহলে নেমে এসেছে শোকের আবহ। ময়দানের বহু পরিচিত মুখের মতো তিনিও স্বপ্ন দেখেছিলেন বড় ফুটবলার হওয়ার। সেই স্বপ্নের পথ ধরেই টাটা ফুটবল অ্যাকাডেমি থেকে উঠে এসে জায়গা করে নিয়েছিলেন দেশের অন্যতম ঐতিহ্যশালী ক্লাবগুলিতে। কিন্তু চোটের কারণে সেই যাত্রা দীর্ঘ হয়নি। ২০০৭ সালেই তাঁরে ফুটবল থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।
কলকাতার তিন প্রধান ক্লাবের জার্সি গায়ে চাপানোর সৌভাগ্য খুব বেশি ফুটবলারের হয় না। আমজ়াদ আলি খান সেই বিরল তালিকার অন্যতম সদস্য। টাটা ফুটবল অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ২০০২ সালে ইস্টবেঙ্গলের হয়ে খেলেন তিনি। পরের বছর কিছু সময়ের জন্য যোগ দেন মোহনবাগানে। এর পর ২০০৪ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত মহমেডান স্পোর্টিংয়ের হয়ে নিয়মিত খেলেন এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন।
রাইট-ব্যাক হিসেবে মাঠে তাঁর উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। রক্ষণে দৃঢ়ত এবং লড়াকু মানসিকতার জন্য কোচদের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন তিনি। শুধু ক্লাব ফুটবল নয়, বাংলার হয়ে সন্তোষ ট্রফিতেও প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন আমজ়াদ। ভারতের জুনিয়র দলের জার্সিতেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।
একজন ফুটবলারের জীবনে সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন চোট। আমজ়াদের ক্ষেত্রেও সেটাই সত্যি হয়েছিল। ২০০৭ সালে পায়ে গুরুতর চোট পাওয়ার পর কার্যত থেমে যায় তাঁর পেশাদার ফুটবল জীবন। যে বয়সে আরও কয়েক বছর ময়দান দাপিয়ে বেড়ানোর কথা ছিল, সেই সময়ই মাঠ থেকে সরে যেতে বাধ্য হন তিনি।
চোটের ধাক্কা শুধু তাঁর কেরিয়ার নয়, জীবনকেও অন্য দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অনেকেই মনে করেন, আরও কিছু বছর খেলার সুযোগ পেলে হয়তো কলকাতার ফুটবলে তাঁর অবদান আরও বড় হয়ে উঠত। কিন্তু ভাগ্যের লিখন অন্য ছিল।
খেলার মাঠ ছাড়ার অনেক বছর পরে অন্য এক কারণে শিরোনামে উঠে এসেছিলেন আমজ়াদ আলি খান। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স এবং নারকোটিক্স শাখার হাতে মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। সেই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।
তবে তাঁর জীবনের সেই বিতর্কিত অধ্যায়ের বাইরেও রয়েছে আর এক পরিচয়— একজন ফুটবলার আমজ়াদ আলি খান। যিনি বাংলার হয়ে খেলেছেন, দেশের জুনিয়র দলে সুযোগ পেয়েছেন এবং কলকাতার তিন প্রধান ক্লাবের জার্সি গায়ে চাপিয়ে ময়দানের ঘাসে নিজের ঘাম ঝরিয়েছেন।
ডার্বির আগে তাঁর প্রয়াণের খবর যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল, মাঠের নায়করা একদিন হারিয়ে যান, কিন্তু তাঁদের স্মৃতি থেকে যায়। কলকাতা ময়দানের অসংখ্য গল্পের ভাঁজে আমজ়াদ আলি খানের নামও থেকে যাবে চিরকাল। তিন প্রধানের জার্সিতে খেলা সেই লড়াকু ডিফেন্ডারকে শেষ শ্রদ্ধা জানাল বাংলা ফুটবল।