‘দাদু স্যর’, ২৩ বছর বিনা পারিশ্রমিকে ছবি এঁকে পড়াচ্ছেন, কুর্নিশ সহকর্মীদের
প্রতিদিন | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৩ বছর। দু’দশকের বেশি সময় ধরে কোনওরকম পারিশ্রমিক-সাম্মানিক ছাড়াই ছাত্র পড়িয়ে যাচ্ছেন ৮৫ বছরের ‘দাদু স্যর’। পুরুলিয়ার কাশীপুরের নপাড়ার বাসিন্দা সুবলচন্দ্র নন্দী। তিনি ন’পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একেবারে বিনা পয়সায় তাঁর পাঠদানে ‘অনুপস্থিত’ শব্দটাই নেই। তবে বয়সের ভারে কোনদিন অসুস্থ বা শরীর খারাপ হলে, গরহাজির থাকলে মন ভালো থাকে না ছাত্রছাত্রী থেকে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও। তিনি যে ছবি এঁকে, মজার ধাঁধা ও গল্প বলে শব্দ বানান। আর সেই শব্দতেই বুঝিয়ে দেন পড়া।
২৩ টা বছর ধরে এভাবে শব্দের জাল বুনতে বুনতে তিনি শব্দের কারিগর। আর সেটা শেখেন তাঁর সহকর্মী অর্থাৎ ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারাও। ছবি এঁকে কেমন সেই শব্দবন্ধ? যেমন নিজের নাম বোঝাতে দাদু স্যার ব্ল্যাক বোর্ডে আঁকেন জুতো, তারপর বল, এরপর চাঁদ। সেই সঙ্গে লেখেন শিবের এক অনুচর। হয়ে যায় তাঁর নাম সুবলচন্দ্র নন্দী। জুতো মানে সু। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় বল, চন্দ্র। আর শিবের এক অনুচর মানে নন্দী। এভাবেই শব্দের সঙ্গে পরিচয় ঘটান তিনি। নপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আগে কাশীপুরের রঙিলাডি গোপালচক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ দেওয়া শুরু করেন সেই ১৯৬১ সাল থেকে।
তখন কোনও গাছতলায় বা কারও বাড়ির চালায় চলত পাঠদান। তখন সরকারি স্বীকৃত ছিল না ওই বিদ্যালয়। অনুমোদন পাওয়ার পর সেখানেই পাকা চাকরি এই দাদু স্যারের। ৪০ বছর শিক্ষকতা করার পর ২০০১ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ততক্ষণে এই শব্দের কারিগরের পরিচিতি ঘটেছে অনেকটাই। তাই ২০০৩ সাল নাগাদ এই নপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪২৬ জন পড়য়ার নিরিখে শিক্ষক কম থাকায় তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আলোক বন্দ্যোপাধ্যায় সুবলবাবুর কাছে অনুরোধ করেন, তাদের স্কুলে পড়ার জন্য। তারপর ভিলেজ এডুকেশন কমিটি অবর বিদ্যালয় পরিদর্শকের অনুমতিক্রমে ন’পাড়া স্কুলে শুরু হয় তাঁর পথ চলা।
শনিবার ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবসে এই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষকরা আমন্ত্রিত ছিলেন। সেখানেই কথা হচ্ছিল তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আলোক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তাঁর কথায়, “অবসরের পর পাঠদান থেকেই তিনি দাদু স্যার হয়ে যান। বয়স তার ৮৫ হলেও এনার্জি একেবারে ৫০-র মতো।” এ যে শুধু কথার কথা নয়। তার শরীরের গড়ন, ছাপ দেখে তা স্পষ্ট। ওই স্কুলের টিচার ইনচার্জ তনুশ্রী ঘোষ বলেন, “উনি খাতায়-কলমে অতিথি শিক্ষক। কিন্তু উনি আমাদের অভিভাবক। শুধু ছাত্রছাত্রীরা নয়। রোজ ওনার কাছেও আমরা শিখি।”