• ১৪ বছরে ১১ দিন ছুটি, অবসরের ৮ বছর পরেও ভালোবেসে স্কুলে যান তৃপ্তি ম্যাডাম
    এই সময় | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • রঞ্জন মাইতি

    বহুল ব্যবহৃত একটি উক্তি — ‘শিক্ষকতা শুধুই একটি পেশা নয়...’। কারও লেখায়, কারও কথায় এই বিষয়ের উত্থাপন আমরা বার বার দেখি। কিন্তু বাস্তবে? পেশার ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষকতাকে যাপন করে বাঁচেন এমন ব্যক্তিও রয়েছেন আমাদের সমাজে। রয়েছেন বাংলাতেই। তেমনই একজন তমলুকের তৃপ্তি বক্সী। ৬৮ বছর বয়সেও নিয়ম করে স্কুলে যান, সন্তানসম স্নেহে শিক্ষা দেন খুদে পড়ুয়াদের। খাতায়-কলমে আর তিনি সরকারি শিক্ষক নন। অবসর নিয়েছেন আট বছর আগেই। এখন বেতন নেই, খাতায় সইয়ের তাড়া নেই। কিন্তু স্কুলে যাওয়ার অভ্যাসে ছেদ পড়েনি। আজও স্কুলের ঘণ্টা বাজার আগেই তমলুকের খোষ্টিকরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেট গিয়ে স্কুলে ঢুকতে দেখা যায় ওই স্কুলেরই অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা তৃপ্তি বক্সীকে।

    এই স্কুলে ২০০৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন তিনি। তখন তিনি নিয়ম অনুযায়ী স্কুলের শিক্ষিকা। ওই ১৪ বছরে তিনি ছুটি নিয়েছিলেন মাত্র ১১ দিন। সেটাও শুধুমাত্র অসুস্থতার কারণে। তাছাড়া আর একটা দিনও নয়, প্রথম থেকেই স্কুল ছিল তাঁর জীবনের অংশ।

    সাতের দশকে শিক্ষকতার জীবন শুরু শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকের ডিমারির বাসিন্দা তৃপ্তি বক্সীর। ১৯৭৯ সালের ৬ অগস্ট শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকের আলুয়াচক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। তার পরে অন্য একটি স্কুলের সহ-শিক্ষিকা হয়েছিলেন। ২০০৪ সালে খোষ্টিকরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে যোগ দেন। তখন স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ছিল ৭০-৭৫ জন। আর এখন ওই স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ১১৮। শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন চার জন। ২০১৮ সালে অবসর নেওয়ার পরেও স্কুলের সঙ্গে তৃপ্তির সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। কেন? অবসরের সময়ে বিদায় অনুষ্ঠানে গ্রামবাসী এবং স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা তাঁকে ফের স্কুলে আসার অনুরোধ করেছিলেন। সাগ্রহে রাজি হয়েছিলেন তৃপ্তি। তারপর থেকেই নিয়ম করে স্কুলে যান তিনি।

    পরিবারের সদস্যরা জানাচ্ছেন, সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়েন তিনি। তারপরে বাড়ির কিছু কাজ সেরে পুজো করে নেন। পুজোশেষে খাওয়াদাওয়া সেরে স্কুলের পথে বেরিয়ে পড়েন তিনি। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। হেঁটেই স্কুলে পৌঁছন।

    স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক সুমিত কুমার সামন্ত। তাঁর কথায়, ‘অবসরের আগে যেমন কাজ করেছেন, এখনও একই ভাবে স্কুলে আসেন। ওঁর মতো শিক্ষিকা আমাদের কাছে খুবই গর্বের।’ এ হেন কাজের জন্য স্বীকৃতিও মিলেছে প্রবীণা এই শিক্ষিকার। ২০২৫ সালে জেলা পরিষদের এক অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মানিত করা হয়েছে।

    তৃপ্তির পরিবারও তাঁর এই অবসরজীবনের শিক্ষকতার কাজে ভীষণ খুশি। তৃপ্তির ভাই কল্যাণ কুমার বক্সী বলছেন, ‘দিদি যেখানে সুস্থ থাকবে, ভালো থাকবে, সেটাই করুক। আমরা দিদির সুস্থতার জন্য সব কিছু করতে চাই। দিদি ওই স্কুলেই পড়াশোনা করেছে। তাই ওঁর স্কুলের প্রতি আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। যতদিন শরীর টানবে, দিদি স্কুলে যাবে।’ তৃপ্তি বক্সির আত্মীয় সুখেন্দু কুইল্যাও শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘আমিও শিক্ষকতা করি। মাসির এই কাজকে শিক্ষক হিসাবে কুর্নিশ জানাই।’

  • Link to this news (এই সময়)