• মায়া সত্য ভ্রম - বিশ্বাস, রহস্য আর অলৌকিকতার মিশেলে ধূসর জগৎ
    এই সময় | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • জীবন ও মৃত্যুর মাঝের ব্যবধান ঠিক কতটা? মৃত্যুর পরেও কি কোনও অস্তিত্ব থেকে যায়? আর মানুষের বিশ্বাসের সীমা কোথায় গিয়ে শেষ হয়? এমন কিছু চিরন্তন প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই তৈরি শমীক রায়চৌধুরী পরিচালিত ছবি ‘মায়া সত্য ভ্রম’। রহস্য, মনস্তত্ত্ব, আধ্যাত্মিকতা এবং অলৌকিকতার মিশেলে তৈরি এই ছবি শুরু থেকেই দর্শককে নিয়ে যায় এক অস্বস্তিকর অথচ কৌতূহলোদ্দীপক জগতে।

    গল্পের কেন্দ্রে পুলিশকর্মী সঞ্জয়, তার স্ত্রী উর্মিলা এবং তাদের ছোট ছেলে টোটোরো। মায়ের সঙ্গে মেলায় গিয়ে আচমকাই নিখোঁজ হয়ে যায় টোটোরো। সন্তানকে খুঁজতে মরিয়া হয়ে ওঠে পরিবার। অন্য দিকে কলকাতায় গবেষণার কাজে এসে নিখোঁজ হয়ে যায় বিদেশিনি সারা। নিখোঁজ হওয়ার আগে দীর্ঘদিন ধরে সে সাক্ষাৎকার নিচ্ছিল রহস্যময় আধ্যাত্মিক ব্যক্তি ত্রিলোকদর্শী বাবার। দাবি, মানুষের শরীর স্পর্শ করেই সে তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে পারে, এমনকী মৃতদের প্রিয়জনের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। সারার অন্তর্ধান এবং টোটোরোর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ক্রমশ একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে যেতে থাকে। শুরু হয় সঞ্জয়ের অনুসন্ধান। পেশায় পুলিশকর্মী হওয়ায় যুক্তি ও প্রমাণের বাইরে কোনও কিছু সহজে বিশ্বাস করতে নারাজ সে। কিন্তু ত্রিলোকদর্শী বাবাকে ঘিরে একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনা তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছবির অন্যতম আকর্ষণ ত্রিলোকদর্শী বাবার অতীত। গল্প এগোতে-এগোতে ফিরে যায় তাঁর শৈশবে। অনাথ শিশু টিলু কী ভাবে ধীরে-ধীরে হয়ে উঠল এই রহস্যময় সাধক, সেই যাত্রাও ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এক দিকে নিখোঁজ শিশুর খোঁজ, অন্য দিকে সারার রহস্য— দু’টি আলাদা গল্পকে শেষ পর্যন্ত সুন্দর ভাবে এক সুতোয় বেঁধেছেন পরিচালক।

    ত্রিলোকদর্শী বাবার চরিত্রে সনৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় ছবির বড় প্রাপ্তি। সংযত অভিনয় এবং শান্ত অভিব্যক্তির মাধ্যমে তিনি চরিত্রটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছেন। সঞ্জয়ের ভূমিকায় সোহম মজুমদার বিশ্বাসযোগ্য। ব্যক্তিগত যন্ত্রণা এবং পেশাগত দায়িত্বের টানাপড়েন তাঁর অভিনয়ে স্পষ্ট। উর্মিলা হিসেবে প্রিয়াঙ্কা সরকারও যথেষ্ট সাবলীল এবং আবেগঘন। অন্যান্য চরিত্রে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভ্রজিৎ দত্ত, শ্রেয়া ভট্টাচার্য-সহ প্রত্যেকেই নিজেদের জায়গায় নজর কেড়েছেন।

    ‘মায়া সত্য ভ্রম’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, ছবি দর্শকদের সহজ উত্তর দিয়ে সন্তুষ্ট করতে চায় না। বরং শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন জিইয়ে রাখে— যা দেখছি, তা সত্যি, নাকি আমাদের মনেরই কোনও ভ্রম? প্রচলিত রহস্য-রোমাঞ্চের বাইরে গিয়ে বিশ্বাস, শোক, উপলব্ধি এবং অজানাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে এই ছবি। এটি এমন কোনও সিনেমা নয়, যা শেষ দৃশ্যের সঙ্গে-সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। পর্দা নামার পরেও প্রশ্নগুলি দর্শকদের মনে ঘুরতে থাকে। তাই একটু অন্য রকম ছবি যে সিনেমাপ্রেমীরা দেখতে ভালোবাসেন, তাঁরা একবার দেখে নিতেই পারেন ‘মায়া সত্য ভ্রম’।
  • Link to this news (এই সময়)