এই সময়: ফরাক্কার কাছে রেললাইনে ধসের জেরে বৃহস্পতিবার থেকে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। শুক্রবারও অধিকাংশ ট্রেন বাতিল হওয়ায় বিমানের টিকিটের দামও কার্যত ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। সেই সুযোগ পুরোমাত্রায় তুলে নেন বাস মালিকরা। রাতারাতি বেসরকারি বাসের ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যায়। সেই টিকিটও অমিল হতে সময় লাগেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের নির্দেশে সাতটি অতিরিক্ত বাস চালায় এনবিএসটিসি। এ দিন সল্টলেকের জলসম্পদ ভবনে এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, 'আমরা প্রথমে অতিরিক্ত ৮টা বাস চালিয়েছিলাম। পরে আরও ২০টা বাস চালানো হচ্ছে।'
রেললাইনে ধসের কারণে এনজেপি থেকে কলকাতাগামী একাধিক ট্রেন বাতিল হওয়ায় উত্তরবঙ্গের আটটি জেলার কয়েক হাজার যাত্রী এ দিনও অসুবিধায় পড়েন। সকাল থেকে বিমান যাত্রার চাহিদা বাড়তে থাকায় একসময়ে টিকিটের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার টাকায়। অন্যদিকে, সাধারণ দিনে কলকাতাগামী ভলভো বাসের টিকিটের দাম ১২০০ টাকা হলেও শুক্রবার দুপুরে সেই দাম গিয়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার টাকায়। মালদা উত্তরের বিজেপি বিধায়ক খগেন মুর্মুর অভিযোগ,'পরিস্থিতির ফায়দা নিয়ে বেসরকারি বাসে 'ব্ল্যাক মার্কেটিং' করা হয়েছে। সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে।' তাঁর দাবি, 'রেল পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় 'বিকশিত ভারত, বিকশিত পশ্চিমবঙ্গ, বিকশিত মালদা' মেলাতে বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন বোসও পৌঁছতে পারেননি।'
সূত্রের খবর, এ দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত শিলিগুড়ির তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাস এবং সংলগ্ন এলাকা থেকে ৩৫টি যাত্রিবাহী বাস কলকাতার দিকে রওনা দেয়। সিআইআই পর্যটন শাখার চেয়ারম্যান সম্রাট সান্যাল বলেন, 'এখন পর্যটনের মরশুম নয়, তাই রক্ষে। না হলে কেবল বাসের ভরসায় যাত্রী ভিড় সামাল দেওয়া সহজ হতো না।' পর পর দু'দিন ট্রেন বাতিল হওয়ায় পর্যটকদের হোটেল ও হোমস্টে বুকিং নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক তন্ময় গোস্বামী বলেন, 'বাতিল বুকিংয়ের ভিত্তিতে পরে যাতে পর্যটকরা আসতে পারেন, সে বিষয়ে হোটেল ও হোমস্টে মালিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।'
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন যাঁরা কলকাতায় চিকিৎসার জন্য আসেন তাঁরা। মালবাজারের বিশ্বজিৎ দত্তের কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে নিউ মাল জংশন থেকে শিয়ালদহ যাওয়ার টিকিট ছিল। চিকিৎসার কারণে তাঁকে যেতেই হতো। তিনি বলেন, 'বাসের টিকিটের দাম শুনেই ঘাবড়ে গিয়েছি। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই।' যাত্রীদের দাবি, দুর্গাপুজোর সময়েও একই ভাবে বাসের ভাড়া বাড়িয়ে রাখা হয়েছে। অক্টোবরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে এক জনের জন্য চার-পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অনলাইনে দেখা যাচ্ছে।
কোচবিহার জেলা থেকে যাঁরা কলকাতায় যাতায়াত করেন এই পরিস্থিতিতে তাঁদের জন্য মোট ১৫টি বাস চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কলকাতা থেকে বালুরঘাট ভায়া মালদা হয়ে সাধারণত তিনটি বাস চলে। সেখানে আরও দু'টি অতিরিক্ত বাস যোগ করে মোট পাঁচটি বাস চালানো হচ্ছে। অন্য দিকে, কলকাতাগামী ছ'টি নিয়মিত বাসের সঙ্গে আরও ১২টি অতিরিক্ত বা স্পেশাল সার্ভিস চালানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই রুটে বাসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮টি। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোচবিহার থেকে কিছু বাস শিলিগুড়িতে পাঠানো হয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার জন্য একটি বিশেষ যোগাযোগের নম্বরও প্রকাশ করেছে উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম। নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর দীপঙ্কর পিপলাই জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এবং যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী এই পরিষেবা চলবে।
উত্তর দিনাজপুর জেলায় রাধিকাপুর এক্সপ্রেস বাতিল হওয়ায় কলকাতাগামী বাসের ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। ভলভো বাসে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে টিকিট কাটতে হয় সৌম্যদীপ পালকে। অন্যদিকে, বোলপুর যাওয়ার ট্রেন ঘুরিয়ে দেওয়ায় মালদা থেকে গাড়ি ভাড়া করে শান্তিনিকেতনের পথে রওনা হয়েছেন সুরজ রায়। মালদাতেও ছবিটা প্রায় একই। ইংরেজবাজারের ব্যবসায়ী দম্পতি বিপুল সেন ও মনিকা সেন অসুস্থ মেয়েকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন বলে কলকাতাগামী ভলভো বাসে মাথাপিছু ৩৫০০ টাকা করে টিকিট কাটতে বাধ্য হয়েছেন। জরুরি কাজে বর্ধমান যেতে শিক্ষক দীপক মণ্ডল ১৫ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করেছেন। রথবাড়ি এলাকার বিভিন্ন পরিবহণ স্ট্যান্ডে টিকিটের কালোবাজারির অভিযোগ ওঠে। জেলার আরটিও অনুপম চক্রবর্তী বলেন, 'অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়ার জন্য পরিবহণ সংগঠন ও কাউন্টারগুলিকে সতর্ক করা হয়েছে।'