এই সময়: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ১৫ দিন আগের তাণ্ডবের রেশ এখনও অব্যাহত। দেওয়াল লিখন, পোস্টার বিতর্ক এবং নাম বদলের প্রস্তাব— সব মিলিয়ে যাদবপুর ফের রাজ্য রাজনীতির উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিজেপির নেতা-নেত্রীরা ক্যাম্পাসে গিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও এই ইস্যুতে ফের সরব হয়েছেন। এর আগে গত সপ্তাহে যাদবপুর এইটবি বাসস্ট্যান্ড থেকে ‘বন্দে মাতরম সভা’ থেকে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছিলেন, ক্যাম্পাসে কারা নেশা করছে তা ড্রোন উড়িয়ে দেখা হবে।
ক্যাম্পাসের দেওয়ালে ‘ফ্রি প্যালেস্তাইন’ বা ‘আজ়াদ কাশ্মীর’ লেখার তীব্র সমালোচনা করে এ দিন সকালে গোলপার্কে একটি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, পশ্চিমবঙ্গে বসে এই ধরনের দেওয়াল লেখার যৌক্তিকতা কোথায়? তাঁর সংযোজন, ‘ফ্রি প্যালেস্তাইন না লিখে ফ্রি পিওকে লিখুন, আমি সাপোর্ট করব।’
মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পরে এ দিন একদল ছাত্র নিজেদের ‘যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী পড়ুয়া’ দাবি করে প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর ছবি-সহ একটি ব্যানার টাঙিয়েছেন। সেখানে প্যালেস্তাইন নিয়ে বাজপেয়ীর পুরোনো মন্তব্য উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে— ‘ইজ়রায়েল আরবদের যে জমি দখল করেছে, তা তাদের ছাড়তে হবে এবং প্যালেস্তিনীয়দের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ পড়ুয়াদের একাংশের বক্তব্য, যে কথা বললে বিজেপি নেতৃত্ব ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিচ্ছেন, সেই একই কথা তাঁদের দলেরই বর্ষীয়ান নেতা বলে গিয়েছেন। বাম ছাত্র সংগঠনগুলি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও এবিভিপি বা এনএসএফ এর সঙ্গে নিজেদের যোগ অস্বীকার করেছে।
মঙ্গলবার রাতে ক্যাম্পাসে ঢুকে কলকাতা পুরসভা দেওয়াল লিখন মুছে দিলেও বৃহস্পতিবার পড়ুয়ারা ফের স্লোগান লিখে তা ভরিয়ে তোলেন। ‘আর্ট এগেনস্ট অপ্রেশন’-এর সদস্যরা মণিপুর, অসমের হিংসার ঘটনা এবং ধর্ষকদের জামিন পাওয়ার প্রতিবাদে দেওয়াল লেখেন। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও মাইকেল মধুসূদনের ছবির পাশে লেখা হয়, ‘এঁরাও কি দিমাগি নকশাল?’ এআইডিএসও চার নম্বর গেটের কাছে নেতাজির ছবি এঁকে ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখার বার্তা দেয়।
এর পাল্টা হিসেবে বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাসে ‘বন্দে মাতরম যাত্রা’ করে এবিভিপি। রামের পাশাপাশি পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি এবং নন্দলাল বসুর আঁকা ছবি আঁকা পোস্টারও তাদের মিছিলে ছিল। যদিও গত ২০ অগস্ট এবিভিপির সমর্থকদের বিরুদ্ধেই নন্দলাল বসুর আঁকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম ভাঙার অভিযোগ উঠেছিল। এ দিনই যাদবপুর ক্যাম্পাসে ত্রিগুণা সেন অডিটোরিয়ামে এক সভায় বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিনহার হুঁশিয়ারি, ‘যাদবপুরে ঢুকে পড়া ভারত–বিরোধী শক্তির সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক ও কর্মীও জড়িত। তাঁদের চিহ্নিত করে কড়া শাস্তি দেওয়া হবে।’ তাঁর মতে, ‘বহিরাগত মাওবাদীরা সাধারণ ছাত্রদের ভয় দেখিয়ে দেশবিরোধী স্লোগান দিতে বাধ্য করছে।’ পার্টি এবং সরকার— যৌথ ভাবে এর বিরুদ্ধে লড়বে বলেও জানান তিনি। বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের দাবি, ‘ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বাঙালি মেধার স্ফুরণ ঘটাতে ঋষি অরবিন্দ এই প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। তাই এর নাম বদলে ‘ঋষি অরবিন্দ বিশ্ববিদ্যালয়’ করা উচিত।’ এসএফআই-এর সর্বভারতীয় সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্যের পাল্টা কটাক্ষ, ‘অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন বিপ্লবী। বিজেপি–আরএসএসের কেউ তো ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েননি। তাই ভনিতা না করে বরং একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা নাথুরাম গডসে ইউনিভার্সিটি করে দিন, ল্যাটা চুকে যায়।’