সব্যসাচী ঘোষ, মালবাজার
‘কেমন আছ? চিনতে পারছ?’––ভিড়ের মধ্যে নাবালিকার আচমকা প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলেন মালবাজারের মহকুমা শাসক উৎকর্ষ খান্ডাল। অনলাইনে বেশি দামের দই বিক্রির অভিযোগে শহরের নেতাজি কলোনিতে একটি মিষ্টির দোকানে হাজির হয়েছিলেন তিনি। ওই গুরুগম্ভীর পরিবেশে ১২ বছরের অরুণিমা ভাদুড়িকে এসডিও চিনবেনই বা কেমন করে? কিন্তু কুছ পরোয়া নেহি! ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী দ্বিগুণ উৎসাহে বলে চলে, ‘১৫ অগস্ট তোমার অফিসে ছবি এঁকে আমি ফার্স্ট হয়েছিলাম না?’ মাত্র কয়েকদিন আগের পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে যায় মহকুমা শাসকের। সেদিন সত্যিই তো তিনি অরুণিমার ছবির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। এ বারে পাল্টা উত্তরের অপেক্ষা করে না নাবালিকা– ‘এখানেই আমাদের বাড়ি। আমার সঙ্গে চলো।’ তার আবদারে সাড়া না দিয়ে পারেননি উৎকর্ষ। মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে এসডিও–র হাত ধরে বাড়িতে হাজির হয় সে। ভিতরে গিয়ে বাড়ির ভগ্নদশা দেখে অবাক হয়ে যান প্রশাসনিক কর্তা। বুঝতে পারেন, নুন আনতে পান্তা ফুরোয়– ভাদুড়ি পারিবারের আর্থিক অবস্থা এমনই। অরুণিমার বাবা তপন ভাদুড়ি পুরোহিতের কাজ করেন। মা সোমা সপ্তাহে একদিন এলাকার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ছবি আঁকা শেখান। তাই দিয়ে কোনওক্রমে সংসার চলে তাঁদের।
এসডিও সাহেবকে মেয়ে ঘরে ডেকে নিয়ে এসেছে, কিন্তু বসতে দেবেন কোথায়? আশেপাশের বাড়ি থেকে ততক্ষণে চেয়ার জোগাড় করার চেষ্টা শুরু করেন তপন। খান্ডাল আর সময় নষ্ট না করে বসে পড়েন ঘরের মেঝেতেই। পড়াশোনার কথা আলোচনা করতে করতে তিনি অরুণিমাকে দেখাতে বলেন তার ছবি আঁকার খাতা।পাতা উল্টে মুগ্ধ হয়ে যান এসডিও। ছোট্ট কিশোরীর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তোমার ছবিগুলো সত্যিই খুব সুন্দর। সব ছবি আমি কিনে নেব। আমাকে বিক্রি করবে?’ ফুটফুটে নাবালিকার উত্তর শুনে আরও চমকে ওঠেন আমলা। শিশু সুলভ সারল্য নিয়ে সে উত্তর দেয়––‘আমি তোমাকে ছবি বিক্রি করব না। এমনিই দিয়ে দেব। তুমি অফিসে রেখে দিও।’
বাড়ির বাইরে ততক্ষণে ভিড় জমে গিয়েছে। পড়শিরা ফিসফিস করে দূর থেকে তপনকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ‘এসডিও সাহেবকে হাতের কাছে পেয়েছ, তোমার ঘরের দুর্দশার কথা বলো। একটা হিল্লে হয়ে যেতে পারে।’ কিন্তু কিছুই বলে উঠতে পারেননি তিনি। উদাস হয়ে চেয়ে থাকেন। শুধু অস্ফুটে একবার বলেন, ‘মেয়ে বড় হোক। এ টুকুই চাই স্যার।’ মালবাজার মহকুমার তরুণ এসডিও, আইএএস উৎকর্ষ খান্ডাল বেরিয়ে যাওয়ার আগে তপনের উদ্দেশে শুধু বলতে পারেন, ‘কোনও রকম অসুবিধা হলে বলবেন। অফিসে সরাসরি চলে আসবেন। কোন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগবে না।’ চোখটা জলে ভিজে যায় তাঁরও।