• মাঝ আকাশে বেঁহুশ পাইলট, প্লেন চালালেন ‘স্পেশাল যাত্রী’
    এই সময় | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • এই সময়: যাত্রী হিসেবে ফ্লাই করছিলেন এক সিনিয়র পাইলট। মাঝ আকাশে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনিই বসে গেলেন ককপিটে। ফ্লাইট ডাইভার্ট করে নেমে পড়লেন মাসকটে।

    ইন্ডিগোর এই ফ্লাইটের যদিও ওমানের রাজধানী মাসকটে নামার কথাই ছিল না। প্রায় ১৫০ যাত্রী নিয়ে সেটি কাতারের দোহা থেকে বেঙ্গালুরু আসছিল। টেক অফ করেছিল দোহার স্থানীয় সময় বুধবার রাত তিনটেয়। বেঙ্গালুরু নামার কথা প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পরে, বৃহস্পতিবার সকালে। কিন্তু, ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন ফ্লাইটের যিনি মুখ্য পাইলট, সেই কম্যান্ডার।

    পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে কো–পাইলট একা ম্যানেজ করতে পারছিলেন না। পাশে সিনিয়রকে কার্যত অজ্ঞান অবস্থায় দেখে তিনি সম্ভবত আরও ঘাবড়ে যান। সূত্রের খবর, মাঝ আকাশেই প্রচন্ড ঘামতে শুরু করেন কম্যান্ডার। কো–পাইলটকে জানান, তিনি অসুস্থ বোধ করছেন। এর পরে তিনি আসনেই ঢলে পড়েন। অভিজ্ঞ পাইলটদের মতে, ককপিটে এক জন পাইলট গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে, অন্য পাইলট যাতে বিমান নির্বিঘ্নে ল্যান্ড করাতে পারেন, তার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কো–পাইলট অসুস্থ হয়ে পড়লে সিনিয়রদের ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কথাই নয়। বৃহস্পতিবারের মতো কোনও কম্যান্ডার অসুস্থ হয়ে পড়লেও কো–পাইলটের একা ম্যানেজ করারই কথা।

    যদিও পাইলটদের একাংশের মতে, কো–পাইলটদের বয়স গড়ে ২২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে হয়। প্রশিক্ষণের সময়ে এই ধরনের ইমারজেন্সি হ্যান্ডল করা আর বাস্তবে তার মোকাবিলা করার মধ্যে ফারাক থাকে। অনেকেই নিজেকে ‘কুল’ রাখতে পারেন না। এক সিনিয়র পাইলটের প্রশ্ন, ‘বৃহস্পতিবার ইন্ডিগোর ফ্লাইটে যদি কোনও সিনিয়র পাইলট যাত্রী হিসেবে না থাকতেন তখন কী হতো? ওই কো–পাইলটকেই তো একা ল্যান্ড করতে হতো!’

    বৃহস্পতিবার কাক ভোরেও ইন্ডিগোর কো–পাইলটের ক্ষেত্রেও অনেকটা প্যানিক অ্যাটাকের মতোই ঘটেছিল বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে। কমান্ডার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পরে নিয়ম মাফিকই কো–পাইলট ‘মে–ডে’ কল করেন। আকাশে কোনও বিমানে চূড়ান্ত ইমারজেন্সি দেখা দিলে পাইলট এই ‘মে–ডে’ কল করেন। বিমান যে বিপদে পড়েছে তা জেনে যান আশপাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া অন্য বিমানের পাইলট এবং ইন্ডিগোর সঙ্গে যোগাযোগে থাকা মাসকটের এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল (এটিসি)। এই অবস্থার কথা কানে যায় এয়ারহস্টেসদের। তাঁরা ইতিমধ্যেই দেখেছেন ইন্ডিগোরই এক কম্যান্ডার পাইলট এবং এক কো–পাইলট যাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন। কারণ, তাঁরা পাইলটের পোশাকেই ছিলেন। সিনিয়র পাইলটেরা বলছেন, ডোমেস্টিক ফ্লাইটে তাঁরা যখন যাত্রী হিসেবে ট্র্যাভেল করেন, তখন সাধারণ পোশাক পরলেও ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে পাইলটের পোশাকেই যাতায়াত করতে হয়। কারণ, যাত্রী হিসেবে থাকলেও ইমিগ্রেশনের সময়ে পাইলটের পোশাক পরলে তবেই বিশেষ ছাড় পাওয়া যায়।

    বৃহস্পতিবার ইন্ডিগোর ফ্লাইটের কেবিন ক্রু হেড যাত্রী হিসেবে থাকা সেই সিনিয়র পাইলটকে পরিস্থিতির কথা জানান। ককপিটের বাঁ–দিকের আসনে বসেন কম্যান্ডার। অসুস্থ পাইলটকে সেখান থেকে সরিয়ে আনা হয়। যাত্রী হিসেবে ফ্লাইটে থাকা সিনিয়র ওই পাইলট দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে। ফ্লাইট তখন প্রায় মাসকট ছাড়িয়ে আরব সাগরে ঢুকে পড়েছে। অসুস্থ কম্যান্ডারকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে ফ্লাইট ডাইভার্ট করে মাসকটে নামার সিদ্ধান্ত নেন দুই পাইলট। সেই মতো যোগাযোগ করা হয় মাসকটের এটিসি–র সঙ্গে।

    পরে ইন্ডিগো জানিয়েছে, মাসকটে নামার পরে অসুস্থ কম্যান্ডারকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি ভালো আছেন। যে যাত্রীরা বেঙ্গালুরু আসছিলেন, তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছতে বেঙ্গালুরু থেকে মাসকটে খালি বিমান পাঠানো হয়। কারণ, মাসকটে তাদের ওই এয়ারবাস ৩২০ নিও বিমান থাকলেও, তাকে উড়িয়ে আনার জন্য দুই পাইলট নেই। কম্যান্ডার হাসপাতালে। যে যাত্রী পাইলট বিমানটি মাধ আকাশ থেকে উড়িয়ে নিয়ে মাসকটে গিয়ে নেমেছিলেন, তিনি ইমারজেন্সি সিচুয়েশন সামলে দিলেও, ডিজিসিএ–র নিয়ম অনুযায়ী মাসকট থেকে বিমান নিয়ে তিনি উড়তে পারবেন না। তাঁকে আবার যাত্রী হিসেবেই ফিরতে হবে।

    তবে প্রশ্ন উঠেছে, এ ভাবে কি এক জন যাত্রী হিসেবে থাকা পাইলট দুম করে ককপিটে বসে যেতে পারেন?

    সিনিয়র পাইলটদের দাবি, এ নিয়ে ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন (ডিজিসিএ)–এর স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি) রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ককপিটে কোনও পাইলট অসুস্থ হয়ে পড়লে, ফ্লাইটে যাত্রী হিসেবে অন্য পাইলট থাকলে, তিনি ফ্লাইটের কন্ট্রোল নিতে পারেন। তবে, সে ক্ষেত্রে সেই বিমানের টাইপ রেটিং (সেই বিমান চালানোর লাইসেন্স) থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট পাইলটের। যার অর্থ, যে পাইলট নিয়মিত বোয়িং ৭৮৭ চালান, তিনি এয়ারবাস ৩২০ বিমানে থাকলেও, তাঁর পক্ষে সেই বিমানের কম্যান্ড নেওয়া সম্ভব নয়। ওই বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা থাকলে তবেই সেটা সম্ভব। এ ছাড়াও যাত্রী পাইলট যদি ওই এয়ারলাইন্সেরই না হয়ে অন্য এয়ারলাইন্সের কর্মী হলেও তিনি সেই ফ্লাইট চালাতে পারেন।

  • Link to this news (এই সময়)