• গা ছমছমে ভয় নিয়ে ভূতুড়ে গ্রামে আছেন লক্ষ্মণ
    এই সময় | ২৯ আগস্ট ২০২৬
  • দুর্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বাঁকুড়া

    দিনের আলো নিভলেই নাকি শোনা যায় কান্নার আওয়াজ! ভেসে আসে নূপুরের শব্দ। মড়মড় করে গাছ ভাঙার আওয়াজও কানে আসে। সেই সঙ্গে ঢিল পড়ে বাড়ি-ঘরে!

    এমনই কাণ্ড-কারখানায় ভূতের আতঙ্কে গাঁ উজাড় হয়েছে এক দশক আগে। কিন্তু অজানা সেই ভয় নিয়ে রয়ে গিয়েছে মাত্র দু’টি পরিবার! সন্ধ্যা নামলে খিল পড়ে বাড়ির দরজায়। বাঁকুড়ার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের চালিবাড়িডিহি গ্রামের ছবিটা এমনই। লোকমুখে যা এখন ‘ভূতুড়ে গ্রাম’ নামেই পরিচিত।

    বাঁকুড়া শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে চালিবাড়িডিহি গ্রাম। এক সময়ের কোলাহলমুখর গ্রামে এখন শ্মশানের স্তব্ধতা। কিন্তু কেন? গ্রামে ঢুকতেই দেখা হলো লক্ষ্মণ বাউড়ির সঙ্গে। তিনি পরিবার নিয়ে এই গ্রামে থাকেন। তিনি শোনালেন গ্রামের ইতিবৃত্তান্ত। একটা সময়ে গঙ্গাজলঘাটির বড়জুড়ি গ্রামের অদূরে জঙ্গল ঘেরা এক উঁচু জমিতে গড়ে উঠেছিল বসতি। বড়জুড়ি থেকে উঠে এসে ১৮টি পরিবার সেখানে বাস করছিল। সেই জায়গার নাম হয় চালিবাড়িডিহি। সব ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু বছর ১২ আগে ঘটে এক ভয়ঙ্কর কাণ্ড।

    কী সেটা? নিজের শিশুসন্তানকে পাশের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে কুপিয়ে খুন করার অভিযোগ ওঠে গ্রামের এক মহিলার বিরুদ্ধে। সেই ঘটনার পর থেকেই নাকি গ্রামে শুরু হয় ভূতুড়ে কাণ্ড-কারখানা। বাসিন্দাদের মনে ঢুকে পড়ে ভয়। সন্ধ্যা নামলে আতঙ্কে গুটিয়ে যেতেন তাঁরা। ক্রমে ভূতের ভয় থেকেই ফাঁকা হয়ে যায় চালিবাড়িডিহি গ্রাম। ভিটে ছেড়ে পুরোনো বড়জুড়ি গ্রামেই ফিরতে থাকেন সবাই। পরিত্যক্ত পড়ে থাকে ছেড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি।

    বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন ও পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে। ভীতি কাটিয়ে চালিবাড়িডিহিতে ফেরানোর চেষ্টা হয় পরিবারগুলিকে। বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু দু’টি পরিবার বাদ দিলে আর কেউ ফেরেনি এই গ্রামে। ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে ভরেছে চারদিক। প্রশাসনের চেষ্টায় গ্রামে ফিরলেও আতঙ্ক কাটেনি দুই পরিবারের। একটি পরিবার লক্ষ্মণের। তিনি বলছেন, ‘ভূতের ভয়ে সবাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে।’ এখনও কী ভূতের ভয় লাগে? লক্ষ্মণের জবাব, ‘ভূতের ভয়ে সব সময়ে বুক দুরুদুরু করে। দিনটা কোনও রকমে কাটলেও রাতটা ভয়ানক।’

    কী হয় রাতে? একরাশ আতঙ্ক নিয়ে লক্ষ্মণ বলে ফেলেন, ‘রাত হলেই বিভিন্ন আওয়াজ শুনতে পাই। কান্নার শব্দ, নূপুরের শব্দ। মড়মড় করে গাছপালা ভেঙে পড়ার আওয়াজ আসে। ঘরের চালে ঢিলও পড়ে।’

    সত্যিই কি এমনটা হয়? পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের রাজ্য কমিটির সহ-সম্পাদক জয়দেব চন্দ্র বলছেন, ‘বেশ কিছু পরিবার রোজগারের প্রয়োজনে যোগাযোগের সুবিধার্থে চালিবাড়িডিহি থেকে বড়জুড়িতে চলে যায় এবং সেখানে স্থায়ী ভাবে বাস করতে থাকে। এটা অনেক পুরোনো বিষয়। অনেকে পুরোনো একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করেন। জেলার বিজ্ঞান কর্মীরা ওখানে সরেজমিনে সব দেখে এসেছেন। আতঙ্কের কোনও পরিবেশ বা পরিস্থিতি নেই।’ যোগ করেন, ‘বিজ্ঞান মঞ্চ এই ধরনের গুজবের বিরুদ্ধে রাজ্য জুড়েই সজাগ। যাঁরা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, তাঁদেরই দায়িত্ব নিয়ে এই কাজ বন্ধ করা উচিত এ বার।’

  • Link to this news (এই সময়)