• প্রাণ খোঁজার প্রহর, সন্ধান নেই ২৯০ ভারতীয়ের, ফিরবে কি ওরা!
    এই সময় | ২৮ আগস্ট ২০২৬
  • এই সময়: গলার কাছে দলা পাকাচ্ছে কিছু যন্ত্রণা। উৎকণ্ঠায় উড়ে গিয়েছে ঘুম। টিভি খুলে খবরের আপডেট নিচ্ছেন আত্মীয়–বন্ধুরা। আর এমন সময়েই টিভির স্ক্রিনে ভেসে ওঠে এক মহিলার ভিডিয়ো। দেখা যায় নেপালের লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া পথ–ঘাট থেকে কাদা–মাখা, বিধ্বস্ত সেই মহিলাকে টেনে বার করে নিয়ে আসছেন উদ্ধারকারীরা।

    বৃহস্পতিবার সকালে টিভির সামনে বসে বিশ্বজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘ওই তো আমাদের মৌ (মৌসুমি)!’ স্বস্তির নিঃশ্বাসের সঙ্গে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সেই খুশির খবর। দেখা গিয়েছে মৌসুমিকে। দুর্গাপুরের মৌসুমি স্বামী অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে নেপালে গিয়েছিলেন বেড়াতে। বুধবার সকাল থেকে খোঁজ নেই। মেয়ে অঙ্কিতা থাকেন বেঙ্গালুরুতে। দুর্গাপুর, পুরুলিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছেন আত্মীয়েরা।

    বুধবার সকাল থেকে শুরু হয় আতঙ্ক। অরিন্দমের আদি বাড়ি পুরুলিয়ায়। বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে পুলিশ এসে একটি ভিডিয়ো দেখায়। তাতেও যে মহিলাকে দেখানো হয়েছে, তিনি মৌসুমি বলেই মনে হয়। অরিন্দমের ভাগ্নি দীপিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘পুলিশের ভিডিয়োতে মামীকেই (মৌসুমি) দেখেছি।’ আশ্বস্ত হয় পরিবার। কিন্তু, সেই আশা মিলিয়ে যেতে বেশি সময় লাগেনি। অঙ্কিতা বিকেলে বলেন, ‘ভিডিয়োর ওই মহিলা আমার মা নন। ভুল খবরে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।’

    শুধু বাংলা থেকে যাওয়া পর্যটকদের পরিবারগুলি দুশ্চিন্তায় রয়েছে এমন নয়, নেপালের বিপর্যয়ের পরে সার্বিক ভাবে মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা পৌঁছে গিয়েছে ৩৫৯–এ! বুধবার সকালে হড়পা বান যে ভাবে নেপালের রাসুয়া–সহ চারটি জেলাকে কার্যত ধুয়েমুছে দিয়েছে, তাতে সরকারি ভাবে নিখোঁজের সংখ্যাটা কমপক্ষে ১,৩০০। যদিও বেসরকারি মতে, এই দু’টি সংখ্যাই অনেক বেশি। সেই নিখোঁজরা কোথায় কী ভাবে আছেন, আদৌ বেঁচে আছেন কি না, সে ব্যাপারে কার্যত কোনও তথ্য নেই পুলিশ, প্রশাসন বা বিপর্যয় মোকাবিলা টিমের কাছে। ওদিকে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রাণপণে চলছে প্রাণের খোঁজ।

    অরিন্দম, মৌসুমী ছাড়াও নেপাল ঘুরে মানসরোবর যাওয়ার কথা ছিল দুর্গাপুরের দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর স্ত্রী সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুভাষচন্দ্র ঘোষের। এ রাজ্যের ৩৩ জন পর্যটক নিখোঁজ বলে এ দিন জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। যদিও বিভিন্ন জেলা ও কলকাতা থেকে পাওয়া খবরে ৩৪ জনের তালিকা মিলেছে। তাঁদের মধ্যে ৩০ জন পর্যটক ২১ অগস্ট কলকাতার একটি এজেন্সির মাধ্যমে মানসরোবরে রওনা দেন। সঙ্গে ছিলেন দুই ম্যানেজার (তালিকা দ্রষ্টব্য)।

    বুধবার সকালের পরে উদ্বেগের প্রহর গুনছে পরিবারগুলি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং বিদেশ মন্ত্রককে নিখোঁজ পর্যটকদের সমস্ত তথ্য পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তর জানিয়েছে, যে ক’টি হেল্পলাইন খোলা হয়েছে, তার কোনওটিতেই নতুন কোনও নিখোঁজের তথ্য আসেনি। প্রতিটি জেলাশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনও পর্যটকের পরিবার যোগাযোগ করলে তা বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরকে জানাতে। মুখ্যমন্ত্রী এ দিন বলেন, ‘নেপাল আমাদের প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র। এই বিপর্যয়ে আমরা ব্যথিত। নিখোঁজদের মধ্যে এক জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে।’ কলকাতা পুলিশের নগরপাল জানান, একটা ট্যুরিজ়ম অর্গানাইজ়েশন নিয়ে গিয়েছিল। তারা জানিয়েছে, তাদের শেল্টার ‘ওয়াশড আউট’।

    খোঁজ নেই হাওড়ার সাঁকরাইলের ৬৮ বছরের অনিতা দাসের। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। পরিবার জানিয়েছে, বুধবার সকাল আটটা নাগাদ ছেলের সঙ্গে অনিতার শেষ কথা হয়েছিল। জানিয়েছিলেন, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছাকাছি রয়েছেন। তাঁর মতোই কৈলাস-মানসরোবর যাওয়ার স্বপ্নপূরণে ২১ অগস্ট রওনা দিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ককর্মী, নিউ টাউনের দেবব্রত রায়চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী লেখা রায়চৌধুরী। এখন তাঁরা কোথায়, কেমন আছেন — কোনও তথ্যই নেই পরিবারের কাছে। উদ্বেগের পারদ চড়ছে। তাঁদের ছেলে রাজর্ষি নয়ডায় অধ্যাপনা করেন। বলেছেন, ‘কলকাতায় ফিরছি। বাবা-মা নিরাপদে আছে কি না, জানি না। কেউ কোনও খবর দিতে পারছে না।’

    নেপালে নিখোঁজ খড়্গপুরের অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী স্বপনকুমার সিনহা। মঙ্গলবার পর্যন্ত মোবাইলে কথা হয়েছে পরিবারের সঙ্গে। তারপরে আর যোগাযোগ নেই। নেপালে গিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়ার বাসিন্দা প্রয়াত তৃণমূল নেতা মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায়েরও কোনও খোঁজ নেই। স্বামী শুভ্রাংশু রায় বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত কোনও ভাবে যোগাযোগ করা যায়নি। প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি।’

    নিখোঁজ দক্ষিণ ২৪ পরগনার সরিষার বাসিন্দা শিক্ষিকা কেয়া প্রামাণিক। উৎকণ্ঠিত পরিবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারছেন না। সোনারপুরের বাসিন্দা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার লোপামুদ্রা কুণ্ডুও ছিলেন পর্যটকদের ওই দলে। বুধবার সকালে পরিবারকে ফোনে জানিয়েছিলেন, চিন সীমান্তে রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের বাসিন্দা সুস্মিতা ভট্টাচার্য (৬০)। বুধবারের ঘটনার পরে তাঁরও কোনও খোঁজ নেই।

    এঁরা সকলেই ছিলেন ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে। উত্তরবঙ্গের সমর মণ্ডল একা গিয়েছিলেন বেড়াতে। নেপাল থেকে বুধবার সকালে ফোনে স্ত্রী দীপিকাকে বলেছিলেন ‘ফিরছি, তবে গায়ে জ্বর।’ স্বামীর ফোনটা রাখার কিছুক্ষণের মধ্যেই টিভি খুলতেই দীপিকার নজরে আসে নেপালের বিপর্যয়ের খবর। সমরের বাবা গোপাল বলেন, ‘ছোট ছেলে বিজয়কে নেপালে পাঠিয়েছি। যদি সমরের কোনও খোঁজ পায়।’ আর নেপালের যে এলাকায় হুড়মুড়িয়ে নেমে এসেছে কাদা–জলের স্রোত, সেখানেই হাইড্রো–প্রজেক্টে কাজ করতেন বাঁকুড়ার ইন্দপুরের যুবক অশোক পাল। খোঁজ নেই তাঁরও।

    এদিকে হুগলির আরামবাগ থেকেও একটি বাসে করে প্রায় ৫০ জন নেপালে বেড়াতে গিয়েছেন। তবে বিপর্যয়ের সময়ে এই বাসের যাত্রীরা ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১৫০ কিমি দূরে চেতন পার্কে ছিলেন। বাসের সবাই সুস্থ ও নিরাপদ আছেন বলে জানা গিয়েছে।

  • Link to this news (এই সময়)