এই সময়: ক্যামাক স্ট্রিটে তৃণমূলের অফিসের টপ ফ্লোরে থাকা বিল বোর্ড ভাঙা নিয়ে ধুন্ধুমার বাধল বৃহস্পতিবার। খাতায়কলমে তৃণমূলের সচিবালয় হলেও ক্যামাক স্ট্রিটের এই দপ্তর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয় হিসেবেই পরিচিত। এ দিন বিকেলে কলকাতা পুরসভার আধিকারিকরা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে সেই অফিসের বিল বোর্ড খুলতে গেলে তুলকালাম পরিস্থিতি তৈরি হয়। কলকাতা পুলিশ, পুরসভার কর্মীদের সঙ্গে অভিষেক, ডেরেক ও’ব্রায়েন–সহ কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের নেতা–কর্মীদের ধস্তাধস্তি হয়। তৃণমূলের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশ–পুরকর্মীদের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূলের তরফে পাল্টা পুলিশের বিরুদ্ধে তালা ভেঙে অফিসে ঢোকার অভিযোগ করা হয়েছে। ডেরেককে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়িতে ফেলে দেওয়া এবং মহিলাদের শ্লীলতাহানির অভিযোগও তুলেছে জোড়াফুল। অভিষেক, ডেরেক, বৈশ্বানর সমেত নেতা–কর্মীদের একটি ফ্লোরে আটকে রেখে বৈধ নোটিস ছাড়া গায়ের জোরে পুরসভা ওই বিল বোর্ড অবৈধ বলে দাগিয়ে সেটি ভেঙেছে বলে দাবি তৃণমূল নেতৃত্বের।
ক্যামাক স্ট্রিটের তৃণমূল অফিসে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই টানাপড়েন চললেও বিল বোর্ড ভাঙা ঠেকাতে পারেননি জোড়াফুলের নেতারা। বিল বোর্ড ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি ক্যামাক স্ট্রিটের অফিস থেকে তৃণমূলের এক ডজন কর্মীকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। তৃণমূলের কালীঘাট শিবির এই ঘটনা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে চলেছে।
এ দিন বিকেলে গোলমাল চলাকালীন ফেসবুক লাইভ করে অভিষেক বলেন, ‘পুলিশ তালা ভেঙে অফিসে ঢুকেছে। তৃণমূলের নামে ভাড়া নেওয়া এই কার্যালয়ে কেন দলের বিল বোর্ড রয়েছে— এই প্রশ্ন তুলে কোনও বৈধ নোটিস ছাড়া প্রায় এক হাজার পুলিশ এনে জোর–জবরদস্তি করে, মহিলাদের শ্লীলতাহানি করে এআইটিসি লেখা সাইনবোর্ড খোলা হয়েছে। শাবল, কোদাল, কাটারি— এই সব নিয়ে আসা হয়েছে। এটা প্রাইভেট প্রোপার্টি। আমরা কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছি।’
তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরের অভিযোগ— ক্যাথিড্রাল রোডে আজ, শুক্রবার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে টিএমসিপি–র সভার আগে বাধা তৈরি করতে পরিকল্পিত ভাবে বিল বোর্ড ভাঙা হয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্য, ‘অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিট অফিসের ওই বিল বোর্ড বেআইনি। কলকাতা পুরসভা নোটিস দিয়েছিল। যে কোনও বেআইনি নির্মাণ ভেঙে দেওয়া উচিত। কিন্তু অভিষেক ও তাঁর সঙ্গীরা যে ভাবে পুরকর্মীদের বাধা দিলেন, পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করলেন, তাতে উনি এক জন সাংসদ, নাকি গুন্ডা বোঝা যাচ্ছে না! অভিষেক কি নিজেকে অক্ষয় কুমার মনে করছেন নাকি?’ সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর প্রতিক্রিয়া, ‘কোনও রাজনৈতিক দলের অফিসে এটা করা যায় না। কিন্তু তৃণমূলের দুর্নীতি–অপরাধের কি অভাব আছে? সেই দিকে না তাকিয়ে গ্যাসকাটার নিয়ে বিল বোর্ড ভাঙা আসলে তৃণমূলকে অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা।’
ক্যামাক স্ট্রিটে বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টে নাগাদ ঘটনার সূত্রপাত। কলকাতা পুরসভার বিজ্ঞাপন বিভাগের কয়েক জন অাধিকারিক শেক্সপিয়র সরণি থানার পুলিশকে নিয়ে আচমকা ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেকের অফিসে হাজির হন। ডেরেক, প্রাক্তন পুলিশকর্তা তথা প্রাক্তন বিধায়ক হুমায়ুন কবীর, বৈশ্বানররা পুর–আধিকারিকদের নিয়ে পুলিশের হাজির হওয়ার কারণ জানতে চান। তখন পুরসভার এক আধিকারিক জানান, ওই বহুতলের টপ ফ্লোরের বাইরের দেওয়ালে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ লেখা বিল বোর্ডটি অবৈধ ভাবে টাঙানো হয়েছে। পুরসভার পক্ষ থেকে ওই বিল বোর্ড খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়। পুর কর্তৃপক্ষের জারি করা একটি নির্দেশিকাও দেখানো হয়। যদিও নোটিসে ‘অ্যাটাচড ফটো’ লেখা থাকলেও কোনও ছবি সেখানে ছিল না বলে অভিষেক পাল্টা পুর–আধিকারিকদের জানান।
ক্যামাক স্ট্রিটে অজস্র সাইনবোর্ড কিংবা বিল বোর্ড রয়েছে— সেগুলির দিকে না তাকিয়ে হঠাৎ তৃণমূলের বিল বোর্ড নিয়ে কেন আপত্তি, এই প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল নেতৃত্ব। অভিষেক বলেন, ‘নির্দেশিকায় কারও স্বাক্ষর অথবা তারিখের উল্লেখ ছিল না। নির্দেশিকায় মেমো নম্বর ছিল না। কোনও বেআইনি নির্মাণ ভাঙার আগে শুনানি করতে হয়, সেটাও করা হয়নি। কে এই বিল বোর্ড নিয়ে অভিযোগ করেছেন, তা–ও তৃণমূলকে জানানো হয়নি।’ অভিষেকের এই প্রশ্ন নিয়ে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত কলকাতা পুর কর্তৃপক্ষ কোন প্রতিক্রিয়া দেননি। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত পুরসভার অধিকাংশ শীর্ষ আধিকারিক জরুরি বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গিয়েছে। পুর কমিশনার স্মিতা পান্ডের সঙ্গে ফোন ও মেসেজে যোগাযোগের একাধিক বার চেষ্টা হলেও তাঁর প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
অভিষেক, ডেরেকদের সঙ্গে প্রথম দফায় বাকবিতন্ডা চলার সময়ে পুরসভার আধিকারিক এবং পুলিশকে সংশোধিত নোটিস নিয়ে আসতে বলেন তৃণমূল নেতৃত্ব। কিছুক্ষণের জন্য ক্যামাক স্ট্রিটের ওই অফিস থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়ান পুলিশ–পুরকর্মীরা। ধীরে ধীরে পুলিশের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সন্ধের মুখে পুলিশ বাহিনী পুরসভার আধিকারিকদের নিয়ে অভিষেকের অফিসে ঢোকে। শুরু হয় ধস্তাধস্তি। ঠেলাঠেলিতে সিঁড়িতে পড়ে যান ডেরেক।
তাঁর উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়েন আরও কয়েকজন। তৃণমূল কর্মীদের ধাক্কায় এক পুলিশকর্মীকেও পড়ে যেতে দেখা যায়। এক পুলিশকর্মীর জামা ধরে টানাটানি করতে দেখা যায় কয়েকজন তৃণমূলকর্মীকে। এরপরে পুলিশ ব্যারিকেড করে দিয়ে তৃণমূলের নেতা–কর্মীদের একটি জায়গায় আটকে পুরকর্মীদের ছাদের যাওয়ার পথ করে দেন। পুরকর্মীরা দ্রুত ছাদে গিয়ে যে লোহার কাঠামোয় তৃণমূলের বিল বোর্ড আটকানো ছিল, তা ভেঙে দেন। তৃণমূলের এক ডজন কর্মীকে ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে থেকে প্রিজ়ন ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পুর–আধিকারিকরা বেরিয়ে যাওয়ার পরে তৃণমূল কর্মীরা ওই ভাঙা বিল বোর্ড নিয়ে বহুতলের ছাদে স্লোগান দিতে শুরু করেন। এআইটিসি লেখা আরও একটি ফ্লেক্সও লাগানোর চেষ্টা হয়।