নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের কারণে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বিপর্যয়ের পরে কয়েক হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ বলে জানিয়েছেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন ভারতীয়ও রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডুতে এনডিটিভি-এর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিপর্যয়ের ভয়াবহ ছবি তুলে ধরেন নেপালের বিদেশমন্ত্রী। তাঁর কথায়, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একের পর এক জনপদ কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।
নেপালের রাসুয়া অঞ্চলে ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসের জেরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শিশির খানাল জানান, এই বিপর্যয়ে ইতিমধ্যেই ১৬০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। একই সঙ্গে বহু পরিবার গৃহহীন হয়েছেন। কয়েক হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ।
নেপালের বিদেশমন্ত্রী বলেন, ‘বিপর্যয়ের আসল ছবি এখনও স্পষ্ট নয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় নিখোঁজদের সঠিক সংখ্যা জানাও কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলি এখনও বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছনোর চেষ্টা করছে।’
এই বিপর্যয়ে নেপালে গিয়ে আটকে পড়েছে বহু ভারতীয়। খবর মিলছে না অনেকের। প্রাথমিক ভাবে বুধবার নেপাল ট্যুরিজ়ম বোর্ডের তরফে জানানো হয়েছিল ১৩৩ জন ভারতীয় নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন। কিন্তু এ দিন উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে নেপালের বিদেশমন্ত্রীর দাবি, সংখ্যাটা ১৩৩ নয়, বরং প্রায় ৩০০। নেপাল সরকারের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিকের খোঁজ মিলছে না। তাঁদের অনেকেই নেপালে পর্যটন বা তীর্থযাত্রার জন্য গিয়েছেন। বিশেষ করে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রাপথ এবং সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বহু ভারতীয় তীর্থযাত্রী ও পর্যটক রয়েছেন। হঠাৎ হড়পা বান নেমে আসায় তাঁদের একটি বড় অংশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে নিখোঁজ ভারতীয়দের সন্ধান এখন ভারত ও নেপাল—দুই দেশের কাছেই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
নিখোঁজ ভারতীয়দের মধ্যে রয়েছেন এ রাজ্যের বহু বাসিন্দাও এই নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন দুর্গাপুরের দম্পতি অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় ও মৌসুমী গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁরা মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছেন। এ রাজ্য থেকে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের মধ্যে অন্তত ৩২ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে জানা গিয়েছে।
নেপালের রসুয়া অঞ্চলের পাশাপাশি অন্যান্য পাহাড়ি এলাকাতেও বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে। বন্যার জলের সঙ্গে কাদা ও বিশাল পাথর নেমে আসায় বহু জনপদ কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। নেপাল ও চিনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১৬২ ছাড়িয়েছে।
রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপাল ও চিনের তিব্বত মিলিয়ে প্রায় ১,৫০০ মানুষ নিখোঁজ। নিখোঁজদের মধ্যে ৮০০-র বেশি বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। ভারত ছাড়াও আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও ক্যানাডার নাগরিকদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পরে নিখোঁজ পর্যটকদের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিপর্যয়ের পর মোট ৫৭৯ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪০০-রও বেশি বিদেশি নাগরিক। ভারত ছাড়াও রয়েছেন বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা। বিভিন্ন দেশের সরকার ও দূতাবাস নেপাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিখোঁজ নাগরিকদের খোঁজ চালাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া: নিখোঁজের তালিকায় মোট ৩৪ জন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের খুঁজে বের করতে নেপাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে অস্ট্রেলিয়া সরকার।
আমেরিকা: অন্তত ৪৭ জন আমেরিকান নাগরিক নিখোঁজ বলে জানিয়েছে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের এক মুখপাত্রের তথ্য উদ্ধৃত করে এই সংখ্যা জানানো হয়েছে।
ব্রিটেন: হড়পা বানের পরে ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিকের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের মুখপাত্রের তথ্যের ভিত্তিতে এই সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে।
ক্যানাডা: ২৪ জন কানাডিয়ান নাগরিকও নেপালে ঘুরতে এসে নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে ক্যানাডায় অবস্থিত নেপালের দূতাবাসের এক মুখপাত্র।
মালয়েশিয়া: নেপালের বন্যাকবলিত এলাকায় অন্তত ১১ জন মালয়েশিয় নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়ার দূতাবাস। তাঁদের সন্ধানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
দক্ষিণ কোরিয়া: নেপালের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৯ জন দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক নিখোঁজ। আরও ১০ জন সেখানে আটকে পড়েছেন বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার বিদেশ মন্ত্রক।
জাপান: নেপালে থাকা পাঁচ জন জাপানি নাগরিকেরও কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গিয়েছে।
উদ্ধার অভিযান চললেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলা যাচ্ছে না। হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে আরও ধস বা হড়পা বানের আশঙ্কা রয়েছে। কোথাও নদীর গতিপথে ধসের কারণে জল আটকে থাকলে পরে ফের আচমকা জল নেমে আসার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিপর্যয়ের পরে নেপাল সেনা, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থাকে কাজে নামানো হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় হেলিকপ্টারের সাহায্যে উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালানো হলেও ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা উদ্ধারকাজকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।
এদিকে, পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ভারতও নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে। ভারতীয় বায়ুসেনার একটি C-130J বিমান নেপালের জন্য প্রায় ১০ টন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে গিয়েছে। সেই ত্রাণের মধ্যে অস্থায়ী আশ্রয়ের সামগ্রী, কম্বল, হাইজিন কিট, সৌরশক্তিচালিত আলো এবং ওষুধ রয়েছে। নেপালের বিদেশমন্ত্রী ভারতের দ্রুত মানবিক সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।