এই সময়, শিলিগুড়ি: নেপাল-চিন সীমান্তে হিমবাহ লেক ভেঙে প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্বেগ বাড়ছে উত্তরবঙ্গ ও সিকিমে। উত্তরবঙ্গ থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরের এই বিপর্যয়ের প্রভাব এড়ানোর উপায় নেই বলেই আশঙ্কা। বিশেষত দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের কপালে দুর্ভোগ থাকতে পারে।
ভোটেকোশি নদী তীরবর্তী রসুয়া জেলা বুধবারের বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তার জেরে পাহাড়ের বিভিন্ন লেকে বিপদঘন্টি বেজে গিয়েছে। সিকিমে প্রায় সাত হাজার ফুট উচ্চতায় অন্তত ১৭টি হিমবাহ লেক বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে কোনও একটি হ্রদ ভেঙে গেলে শুধু সিকিম নয়, বঙ্গের চার জেলায় প্রভাব পড়তে পারে। ২০২৩-এর ৪ অক্টোবর উত্তর সিকিমের দক্ষিণ লোনার্ক হিমবাহ হ্রদ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা সেই আশঙ্কারই ভয়াবহ নজির।
ও দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ ভেঙে যাওয়ার পরে তিস্তার জলস্ফীতিতে সিকিমের পাশাপাশি দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি কোচবিহারের একাংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। শতাধিক মানুষ মারা যান। মৃতদেহ উদ্ধারের কাজে কোচবিহার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত পৌঁছতে হয়েছিল। একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয় এবং সেনা ছাউনি জলের তোড়ে | ভেসে যায়। দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদ ভেঙে পড়ার বিষয়ে সিকিম সরকারের কাছে আগাম সতর্কবার্তা ছিল। তা সত্ত্বেও বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, ২০২৩-এর সেই বিপর্যয়ের দিনে দক্ষিণ লোনার্ক হ্রদের কাছে নেপালে পর পর কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছিল। এ বারও একই সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, ভূমিকম্পের জেরে হিমবাহ-সৃষ্ট কোনও লেকের পাড় ভেঙে জলস্রোত কয়েকটি শাখানদী দিয়ে ভোটেকোশী নদীতে নেমে আসে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই ধরনের ঘটনাকে বলা হয় ল্যান্ডস্লাইড লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা এলএলওএফ। আইআইটি মুম্বইয়ের আর্থ সায়েন্স বিভাগের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়র মলয় মুকুলের বক্তব্য, 'নেপাল-চিন সীমান্ত এলাকার ভোটেকোশির একটি শাখানদীতে সম্ভবত এলএলওএফ হয়েছে। ভূমিকম্পের জেরে হিমবাহ লেক ভেঙে এই বিপর্যয় হয়ে থাকতে পারে। বিস্ফোরণের আগে ওই এলাকায় কয়েকটি ভূকম্পন হয়েছিল বলেও জানা গিয়েছে।'
উত্তর সিকিমে শাকো চু হিমবাহ-সৃষ্ট লেকটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। গত নভেম্বরে উত্তর সিকিমের ১৭টি লেকের পরিস্থিতি বিশেষজ্ঞ দল পর্যালোচনা করে। তারা হিমবাহ লেক বিস্ফোরণ ঠেকাতে কয়েকটি পরামর্শও দেয়। কিন্তু হিমবাহ লেকের বিস্ফোরণ সম্পূর্ণ ভাবে ঠেকানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত নন। মলয় মুকুলের ব্যাখ্যায়, 'হিমবাহ লেক ভেঙে বিপর্যয়ের পিছনে মূলত দু'টি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। দুর্ঘটনার আগে ভূমিকম্প হয়ে থাকতে পারে। আবার তাপমাত্রার হেরফেরের কারণে অ্যাভালান্স বা তুষারধসও হতে পারে। কারণ যেটিই হোক, হিমালয়ে যেভাবে তাপমাত্রার হেরফের হচ্ছে, তা উদ্বেগজনক। সিকিমও সেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।'
২০২৩-এর বিপর্যয়ের পর থেকেই অবশ্য সিকিম রাজ্য প্রশাসন এবং কালিম্পং জেলা প্রশাসন নজরদারি চালাচ্ছে। তিস্তা নদীর তীরে লোকজনকে বসবাস করতে দেওয়া হচ্ছে না। নতুন করে কোনও স্থায়ী কাঠামোও তৈরি করতে দেওয়া হচ্ছে না। কালিম্পং জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, আগের বিপর্যয় মোকাবিলা করতে প্রশাসনকে এখনও হিমশিম খেতে হচ্ছে। নতুন করে আর কোনও বিপদ ডেকে আনতে তারা চাইছেন না।
নেপাল-চিন সীমান্তের ভোটেকোশি থেকে উত্তর সিকিমের হিমবাহ লেক-দু'টি ক্ষেত্রেই একই সতর্কবার্তা সামনে আসছে। ভূমিকম্প, হিমবাহ গলন, তুষারধস এবং হ্রদের জলের চাপ, একাধিক কারণ এক সঙ্গে কাজ করলে বিপর্যয়ের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। দক্ষিণ লোনার্কের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এই জলস্রোত সিকিমের গণ্ডি পেরিয়ে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।