দিগন্ত মান্না, নন্দীগ্রাম
নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনকে হাতিয়ার করে ২০১১–য় রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল। ২০০৯ থেকে ২০২১ পর্যন্ত নন্দীগ্রাম বিধানসভা ছিল তৃণমূলের দখলে। ২০২৬-এ পালাবদলের পরে সেই নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে প্রার্থী খুঁজতে কালঘাম ছুটছে তৃণমূলের। পুজোর আগে নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। লড়াই করা তাঁদের পক্ষে যে কঠিন হবে তা মানছেন জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা চিত্তরঞ্জন মাইতি কোনও রাখঢাক না–রেখেই বলছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত ইমেজে নন্দীগ্রামে বিজেপি জিতবে।’ আবার তৃণমূল নেতা অখিল গিরির অভিযোগ, তৃণমূল কর্মী–সমর্থকদের ভয় দেখাচ্ছে পুলিশ। অভিযোগ অস্বীকার করছে শাসকদল বিজেপি।
জমি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০০৭–এ উত্তাল হয় নন্দীগ্রাম। রাজনৈতিক সংঘর্ষে বহু মানুষ প্রাণ হারান। তৎকালীন শাসকদল বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে নন্দীগ্রাম। প্রভাব পড়ে ভোটবাক্সেও। ২০০৯–এর বিধানসভা উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামে প্রথম জয়ের স্বাদ পায় তৃণমূল। বিধায়ক হন ‘শহিদ মাতা’ ফিরোজা বিবি। ২০১১–য় বামফ্রন্টকে হারিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। সে বারও নন্দীগ্রাম থেকে তৃণমূলের টিকিটে জিতে বিধায়ক হন ফিরোজা। ২০১৬–য় তৃণমূলের টিকিটে নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হন শুভেন্দু অধিকারী। মন্ত্রীও হয়েছিলেন। ২০২০–তে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু। ২০২১–এ রাজ্যে তৃতীয় বার তৃণমূল ক্ষমতায় এলেও নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর কাছে ১৯৫৬ ভোটে হেরে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৬–এর বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর— দুই কেন্দ্রেই জয়ী হন শুভেন্দু। নন্দীগ্রামে তিনি তৃণমূলের পবিত্র করকে ৯৬৬৫ ভোটে হারান।
মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে শুভেন্দু নন্দীগ্রাম বিধানসভা থেকে পদত্যাগ করেন। রাজনৈতিক মহলের অনুমান, পুজোর আগে নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন হতে পারে। জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে গেরুয়া শিবিরে। বিভিন্ন সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পকে সামনে রেখে জনসংযোগও শুরু করে দিয়েছে তারা। তবে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগেই কার্যত হার কবুল করে নিচ্ছেন তৃণমূলের একাধিক নেতা। চিত্তরঞ্জন মাইতি যেমন বলছেন, ‘নন্দীগ্রাম বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর নির্বাচন কেন্দ্র। ওখানে আমাদের জেতার কোনও সুযোগই নেই। আমাদের দলের আশি ভাগ নেতা–কর্মী এখনও শুভেন্দুর লোক। তৃণমূলে থাকাকালীন তিনি অসংখ্য অনুগামী তৈরি করেছিলেন। সেই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাই নন্দীগ্রামে আমাদের এবার জেতার কোনও সম্ভাবনা নেই।’ তাঁর দাবি, ‘রাজ্য সরকার গুন্ডা দমন আইনের নামে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতে চায়। তাই ভয়ে কেউ আর প্রকাশ্যে তৃণমূলও করতে চাইছেন না।’
পুজোর আগে নন্দীগ্রাম বিধানসভার উপনির্বাচন হবে ধরে নিয়ে প্রার্থী খুঁজতে শুরু করছে তৃণমূলও। তবে দলীয় সূত্রের খবর, ওই উপনির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে কেউ ভোটে দাঁড়াতে চাইছেন না। বিষয়টি নিয়ে একাধিক বার বৈঠকে বসেছেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী অখিল গিরির অভিযোগ, বলেন, ‘দলীয় মিটিংয়ে গেলেই পুলিশ তৃণমূল কর্মীদের বাড়িতে চড়াও হচ্ছে। ভয়ে কেউ সামনে আসতে চাইছেন না।’ তাঁর কথায়, ‘নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে কে প্রার্থী হবেন তা ঠিক করবেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির ব্যর্থতাকে হাতিয়ার করে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে আমরা লড়াই করব।’
রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সিন্টু সেনাপতি বলছেন, ‘তৃণমূলকে রাজ্যের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে তৃণমূলের হয়ে কেউ ভোটে দাঁড়াতে চাইছেন না। নন্দীগ্রামের মানুষ মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়ন–যজ্ঞে শামিল হয়েছেন। উপনির্বাচনে আমাদের দলের প্রার্থী এক লক্ষেরও বেশি ভোটে জিতবেন।’