• দেদার বিকোচ্ছে শুভেন্দু, মোদীর ছবি দেওয়া রাখি
    এই সময় | ২৭ আগস্ট ২০২৬
  • সুমন ঘোষ, সবং

    ঝুঁকি নিয়েই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবি দিয়ে রাখি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তা যে এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাবে তা বুঝতে পারেননি বিক্রেতারা। কিন্তু সেটাই ঘটে গেল! লাভের আশায় আবার নতুন করে সেই রাখি তৈরির কাজ শুরু করেছেন তাঁরা। এমনটাই দেখা গেল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সবংয়ের তেমাথানিতে।

    রাজ্যে পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই বদল ঘটল রাখিতেও। আগে যে রাখিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি থাকত, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও দেশের প্রধানমন্ত্রী! হরেক কিসিমের রাখি দেখতে দেখতে ওই ছবিওয়ালা রাখিতে নজর পড়তেই দু’চার ডজন কিনে নিচ্ছেন ক্রেতারা। তাপস পাত্র যেমন বলছেন, ‘কিছুক্ষণ আগেই জানতে পারলাম, মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেওয়া রাখি পাওয়া যাচ্ছে। শুনেই ছুটে এসে দেখি মাত্র দু’ডজ়ন রাখি পড়ে রয়েছে। সব নিয়ে নিলাম।’

    কিন্তু কেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ছবি দেওয়া রাখি নিচ্ছেন? তাপসের ব্যাখ্যা, ‘শুভেন্দু অধিকারী আমাদের অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার গর্ব। জেলার জন্য অনেক কাজ করেছেন। তাই তো তঁার ছবি দেওয়া রাখি সকলকে পরাব।’ সাধারণ মানুষও কিন্তু ফুল, জগন্নাথ দেবের ছবি দেওয়ার রাখির পাশাপাশি শুভেন্দু অধিকারী, নরেন্দ্র মোদীর ছবি দেওয়া রাখিও কিনছেন। ক্রেতা সঞ্জয় ভুঁইয়া বলেন, ‘নানা ধরনের রাখি কিনব বলেই এসেছিলাম। যখন দেখলাম ফুলের রাখি, বিভিন্ন নক্সার রাখির সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি দেওয়া রাখিও রয়েছে, তা-ও কয়েকটি করে কিনে নিলাম। এ বার এটা যে নতুন।’

    তেমাথানির রাখি বিক্রেতা স্বপনকুমার অট্ট জানাচ্ছেন, তিনি খুচরোর পাশাপাশি পাইকারি রাখিও বিক্রি করেন। যে কারণে তেমাথানি থেকে কিছুটা দূরে ৩০টি পরিবারের শতাধিক ব্যক্তিকে দিয়ে রাখি তৈরির কাজও করান। পাড়ার সকলে রাখি তৈরির কাজ করেন বলে পাড়াটিরও নাম হয়ে গিয়েছে ‘রাখিপাড়া’। স্বপন বলেন, ‘জমানা বদলেছে। আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি দেওয়া রাখি তৈরি করতাম। এ বার ভেবে দেখলাম, যদি মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে রাখি তৈরি করলে কেমন হয়! বিশ্বাস করুন, বেশ ঝুঁকি নিয়েই হাজার পাঁচেক রাখি তৈরি করেছিলাম। সব একদিনেই শেষ হয়ে গেল! এত চাহিদা দেখে আবার রাখি তৈরির কাজ শুরু করেছি।’

    যে রাখি তৈরি করেছিলেন, তার এক ডজ়নের দাম ছিল ৭২ থেকে ৮৪ টাকা। এ বার দাম বাড়বে। বিক্রি হবে ৮৪ থেকে ৯৬ টাকা ডজ়নে। রাখি পূর্ণিমায় রক্ষাবন্ধনের কথা কমবেশি সকলের জানা। মূলত ভাই-বোনের পবিত্র ভালোবাসা ও সুরক্ষার প্রতীক। তবে রাখির শেকড় ছড়িয়ে রয়েছে পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনির সঙ্গেও। বারবার তার পরিবর্তনও দেখা গিয়েছে। পুরাণ অনুসারে, দেহাসুরের লড়াইয়ের সময়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে রক্ষা করতে স্ত্রী শচী একটি পবিত্র সুতো বা রাখি ইন্দ্রের ডান হাতে বেঁধেছিলেন। মহাভারত অনুসারে, শিশুপালের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ে শ্রীকৃষ্ণের আঙুল কেটে রক্তপাত হলে দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে কৃষ্ণের আঙুলে বাঁধেন। যমের হাতে রাখি বেঁধেছিলেন বোন যমুনা। সন্তুষ্ট হয়ে যম বোনকে অমরত্বের বরদান করেন।

    মধ্যযুগের ইতিহাসে, চিতোরের রানি কর্ণাবতী বিপদে পড়ে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে রাখি পাঠিয়ে নিরাপত্তার সাহায্য চান। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়েও হুমায়ুন রাখির মর্যাদা রেখে রানিকে রক্ষা করতে সৈন্য পাঠান। বলিরাজা ও লক্ষ্মীকে নিয়েও এমন কাহিনি রয়েছে। আর ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বাংলার সমাজে হিন্দু ও মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাখিবন্ধন উৎসবের কথা তো প্রায় সকলের জানা।

    বর্তমানেও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল রাখি। অনেকেই বলছেন, ‘শুধু বিজেপি কর্মী-সমর্থকরাই যে এই রাখি কিনবেন, এমন নয়। বর্তমান সরকারের সমর্থনে রয়েছে প্রমাণ করতেও বহু উৎসাহী মানুষ কিন্তু এই রাখি নিয়েই বাড়ি ফিরবেন। রাজনীতি যে বড় বালাই!’

  • Link to this news (এই সময়)