এই সময়: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে বুধবার রাত পর্যন্ত নিখোঁজ বহু বাঙালি পর্যটক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন একটি ট্রাভেল ক্লাবের সঙ্গে যাওয়া ৩০ জন। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না কলকাতার ওই ট্রাভেল ক্লাবের দুই ম্যানেজারেরও। এই দলে আমেরিকা থেকে আসা এক বাঙালি পর্যটকও রয়েছেন। কলকাতার কসবার কয়েক জন বাসিন্দাও ওই দলে রয়েছেন বলে রাতে জানা গিয়েছে। যদিও তাঁদের বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি। একটি সূত্রের খবর, হুগলির চন্দননগর এবং উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের বাসিন্দারাও নাকি বেড়াতে গিয়ে আটকে পড়েছেন নেপালে।
বুধবার সকাল ন’টার কাছাকাছি যখন এই হড়পা বানের কথা জানা যায়, তখন থেকেই শুরু হয় এঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা। কলকাতার ট্রাভেল ক্লাব ‘চলো যাই’–এর সিএমডি দিব্যজ্যোতি বসু বুধবার রাতে জানিয়েছেন, এই পর্যটকদের পরিবারেরা উদ্বিগ্ন। তাঁরা সরাসরি প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে কথা বলছেন দিব্যজ্যোতির সঙ্গে। যদিও নেপালে থাকা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
বুধবার রাতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক্স–এ লেখেন — ‘আমি গভীর ভাবে মর্মাহত। এই ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগে যে সমস্ত শোকসন্তপ্ত পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তাদের আমি আন্তরিক সমবেদনা জানাই। আমরা নেপালের জনগণের পাশে দৃঢ় ভাবে আছি। ১০০ জনেরও বেশি ভারতীয় দর্শনার্থীর বেশিরভাগই কৈলাস-মানসরোবর যাত্রায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন। তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার খবরে আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।’ মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে পশ্চিমবঙ্গ সরকার রয়েছে। কাঠমান্ডুতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ সরকার যোগাযোগ ও সমন্বয় রেখে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে নিখোঁজ বা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঠিক সংখ্যা জানার কাজ চলছে। আটকে পড়া মানুষদের দ্রুত সহায়তা এবং উদ্ধারের সুবিধার্থে তাঁদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত পরিস্থিতির উপরে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। নেপালে আটকে পড়া পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের সাহায্যে বুধবার রাতেই হেল্পলাইন চালু করেছে রাজ্য সরকার। রাজ্য পুলিশের সদর দপ্তর ভবানী ভবনে এই হেল্পলাইনের নম্বর ০৩৩–২৪৭৯৩৩১১, ৯১৪৭৮৯০১৮১। নেপালে ভারতীয় দূতাবাসের নম্বর (ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ) +৯৭৭৯৮৫১৩১৬৮০৭ এবং +৯৭৭৯৭০৯১০৭৫০০।
নেপালে নতুন ছবির শুটিং করতে গিয়ে অভিনেতা খরাজ মুখোপাধ্যায় সস্ত্রীক আটকে পড়েছেন বলে তাঁর ছেলে তমোঘ্ন (বিহু) মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কাছাকাছি নেই অভিনেতা। শুধু হড়পা বানে বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণেই অভিনেতাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না বলে তমোঘ্ন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি বলেই মনে হয়। বাবার সঙ্গে মা-ও রয়েছেন। গতকালই আমার সঙ্গে মায়ের কথা হয়েছে। তবে আজ আর যোগাযোগ করতে পারিনি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে ফ্লাইট পেতে অসুবিধা হচ্ছে বলেই শুনেছি। আশাকরি শারীরিক ভাবে ওঁরা ঠিকই আছেন।’
এদিকে দিব্যজ্যোতির কথায়, ‘কাঠমান্ডুর সম্রাট ট্রাভেল এজেন্সি এই ট্যুর অর্গানাইজ় করেছে। ওদের নিজেদের হেলিকপ্টার রয়েছে। এই পর্যটকদের সকলেই কৈলাস–মানসরোবরে গিয়েছেন। ৩০ জন পর্যটকের সঙ্গে আমাদের দুই ম্যানেজার জয়ন্ত সান্যাল ও নৃপেন সরকার রয়েছেন।’ উল্লেখ্য, এই ম্যানেজারদের মোবাইল রোমিং করা থাকে। সকাল আটটা নাগাদ তাঁদের সঙ্গে শেষবারের মতো যোগাযোগ হয়েছিল। পর্যটকদের মধ্যে কেউ কেউ নাকি তখন ফেসবুক লাইভ–ও করেছিলেন। কিন্তু, হড়পা বানের খবর আসার পর থেকে তাঁদের আর কোনও খোঁজ নেই।
দিব্যজ্যোতি জানিয়েছেন, বুধবার সকাল পর্যন্ত দলটি তিব্বতের সীমান্ত এলাকাতেই ছিল। সেখান থেকে মানসরোবরের দিকে রওনা হয়েছিল দলটা। মনে করা হচ্ছে, যে রুট দিয়ে তাঁরা এগোচ্ছিলেন, সেই এলাকাই হড়পা বানে ভেসে গিয়েছে। পর্যটকদের সঙ্গে দিব্যজ্যোতিরা যেমন যোগাযোগ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তেমনই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে সম্রাট ট্রাভেলের পক্ষ থেকেও। দুপুরে পর্যটকদের খোঁজে সম্রাট ট্রাভেলের হেলিকপ্টারও পাঠানো হয়েছিল এলাকায়। কিন্তু, কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। এই ভয়ঙ্কর বানের পরে ওই এলাকায় মোবাইলের কোনও নেটওয়ার্ক নেই। হতে পারে, এই পর্যটকেরা কোথাও আটকে রয়েছেন। তাঁরা যেমন কোনও যোগাযোগ করতে পারছেন না, তেমনই তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, নেপালের এই ভয়ঙ্কর হড়পা বানে নিখোঁজ ১০৫ জন ভারতীয়ের মধ্যে ৭১ জনই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। ‘চলো যাই’ সংস্থার সঙ্গে যে ৩০ জন নেপালে গিয়েছেন, তাঁদের বাইরেও কলকাতা এবং রাজ্যের আরও পর্যটক রয়েছেন। যে পর্যটক আমেরিকা থেকে এসেছিলেন, তাঁর নাম অনির্বাণ ভট্টাচার্য বলে জানা গিয়েছে। দিব্যজ্যোতি জানিয়েছেন, পর্যটকদের দলের সবাই প্রাপ্তবয়স্ক।