• শিশুর সর্দি-কাশি হলেই কাফ সিরাপ? স্নায়বিক ও হৃদজনিত সমস্যা কমাতে ব্যবহারে রাশ কেন্দ্রের
    এই সময় | ২৫ আগস্ট ২০২৬
  • এই সময়: সর্দি-কাশির উপসর্গ কমাতে ব্যবহৃত ‘কোল্ড কম্বিনেশন’ ওষুধে এ বার ছোট শিশুদের জন্য আরও কড়া রাশ টানল কেন্দ্র। চার বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে ক্লোরফেনিরামাইন ম্যালিয়েট (সিপিএম) ও ফিনাইলএফ্রিন (পিই)-যুক্ত সব ধরনের ফিক্সড ডোজ় কম্বিনেশন (এফডিসি) ওষুধের উৎপাদন, বিক্রি ও বণ্টনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

    সর্দিকাশির প্রচলিত ওষুধের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই এই দু’টি যৌগের কম্বিনেশন ব্যবহার হয়। কিন্তু স্নায়বিক ও হৃদজনিত সমস্যার আশঙ্কায় এই বিধিনিষেধ আরোপ করল স্বাস্থ্য মন্ত্রক। শনিবার জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই ধরনের ওষুধের লেবেল, প্যাকেজ ইনসার্ট এবং প্রচারমূলক সামগ্রীতে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিতে হবে — চার বছরের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে এই কম্বিনেশন নিষিদ্ধ। তবে স্বাস্থ্যকর্তারা জানাচ্ছেন, এটি হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংমিশ্রণের নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির পর্যালোচনা এবং ড্রাগস টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজ়রি বোর্ড (ডিটিএবি)-এর সুপারিশের পরেই বিধিনিষেধের পরিধি বাড়ানো হয়েছে।

    কাজ কী দুই ওষুধের? সিপিএম হলো অ্যান্টিহিস্টামিনিক বা অ্যান্টি–অ্যালার্জিক ওষুধ। অ্যালার্জিজনিত হাঁচি, শুকনো কাশি, নাক দিয়ে জল পড়ার মতো উপসর্গ কমাতে এটি ব্যবহৃত হয়। পিই হলো নেজ়াল ডিকনজেস্ট্যান্ট, যা নাকের বন্ধভাব কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। ফলে দুই উপাদান একসঙ্গে সর্দি-নাক বন্ধের একাধিক উপসর্গ সামলানোর উদ্দেশ্যে ‘কোল্ড কম্বিনেশন’ হিসেবে দেওয়া হয়।

    তা হলে ঝুঁকিটা কোথায়? ফার্মাকোলজির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, সিপিএম-যুক্ত সর্দিকাশির ওষুধে ঘুমভাব বা ঝিমুনির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। অতিরিক্ত ডোজ়ে যা গুরুতর স্নায়বিক সমস্যা ডেকে আনতে পারে। অন্য দিকে পিই ডিকনজেস্ট্যান্টে হৃদস্পন্দন দ্রুত হওয়া-সহ বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষত ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ভুল ডোজ়, অতিরিক্ত মাত্রা বা একাধিক ওষুধে একই উপাদান থাকলে অনিচ্ছাকৃত ওভারডোজে়র ঝুঁকি বাড়ে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নালেও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এই দু’টি ওষুধের কম্বিনেশনে খিঁচুনি ও দ্রুত হৃদস্পন্দনের মতো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

    এই সিদ্ধান্ত ১৯৪০–এর ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিকস অ্যাক্টের ২৬এ ধারা অনুযায়ী জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজ়েশন (সিডিএসসিও)। তবে কেন্দ্র কোনও নির্দিষ্ট বিকল্প ওষুধের তালিকা দেয়নি। ছোট শিশুর সাধারণ সর্দি-নাক বন্ধে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপসর্গভিত্তিক পরিচর্যা— যেমন নাকে স্যালাইন ড্রপ, পর্যাপ্ত তরল ও বিশ্রাম নিতে পারে। জ্বর বা অন্য উপসর্গ থাকলে শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী চিকিৎসক পৃথক ওষুধ নির্ধারণ করতে পারেন।

    তাই চার বছরের কম বয়সি শিশুকে নিজের সিদ্ধান্তে কোনও কাশি-সর্দির কম্বিনেশন সিরাপ দেওয়ার বদলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ পথ বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শাম্বসম্রাট সমাজদার বলেন, ‘চার বছরের বয়সসীমা নিষিদ্ধ মানে কিন্তু সেই বয়স পেরোলেই এই কম্বিনেশনের ওষুধ ব্যবহারের স্বয়ংক্রিয় ছাড়পত্র দিই না আমরা। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে কাশি-সর্দির কম্বিনেশন ওষুধে অপ্রয়োজনীয় উপাদান ও অতিরিক্ত মাত্রার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই শুধু ব্র্যান্ড নয়, ওষুধের উপাদানও খেয়াল করা জরুরি।’ তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, অধিকাংশ সাধারণ সর্দি নিজে থেকেই সেরে যায়। ফলে প্রয়োজন না থাকলে এমন ওষুধ এড়িয়ে চলা এবং ডাক্তার দেখানোই বিচক্ষণতা।

  • Link to this news (এই সময়)