• সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানল কেরালা, বিপজ্জনক পথকুকুরদের জন্য ইউথেনেশিয়ার গাইডলাইন
    এই সময় | ২৪ আগস্ট ২০২৬
  • পাগল, রেবিস আক্রান্ত বা মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠা পথকুকুরদের মানবিকভাবে চিরঘুমে পাঠানোর জন্যে ইউথানেশিয়ার নতুন SOP জারি করল কেরালা সরকার। প্রতিটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় কমিটি পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবে। শুধুমাত্র প্রশিক্ষিত পশুচিকিৎসকরাই নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এই প্রক্রিয়া শেষ করতে পারবেন বলে এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার কোনও অপব্যবহার বা বিভ্রান্তি এড়াতে এ বার একটি বিস্তারিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (SOP) বা খসড়া নীতি প্রস্তুত করেছে কেরালার প্রাণীসম্পদ বিকাশ বিভাগ (Animal Husbandry Department)।

    ২০২৬ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট মানুষের স্বার্থে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক কুকুরকে মানবিকভাবে ইউথেনেশিয়া বা মার্সি কিলিংয়ের অনুমতি দিয়েছিল। শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পরে পথকুকুরদের নিয়ন্ত্রণে নতুন পদক্ষেপ করল কেরালা সরকার। রাজ্যে রেবিস বা জলাতঙ্কে আক্রান্ত, দুরারোগ্য অসুস্থতা অথবা মানুষের জন্য বিপজ্জনক প্রমাণিত হওয়া পথকুকুরদের ইউথেনেশিয়া বা Mercy Killing-এর ক্ষেত্রে বিস্তারিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর বা SOP অনুমোদন করা হলো।

    নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনও পথকুকুরকে ইউথেনেশিয়া করার সিদ্ধান্ত সরাসরি কোনও পুরসভা বা স্থানীয় আধিকারিক নিতে পারবেন না। প্রতিটি ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য স্থানীয় স্তরে পথকুকুরদের জন্য ম্যানেজমেন্ট কমিটি কাজ করবে। এই কমিটিতে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি, পশুচিকিৎসক এবং পশুকল্যাণ সংক্রান্ত প্রতিনিধিরা থাকবেন।

    কোনও কুকুর সত্যিই রেবিসে আক্রান্ত কি না, দুরারোগ্য কোনও রোগে অসুস্থ কি না অথবা মানুষের জন্য বিপজ্জনক কি না—প্রমাণ ও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নির্বিচারে পথকুকুর মেরে ফেলার অনুমতি এই নির্দেশে দেওয়া হয়নি।

    খসড়া এসওপি (SOP) অনুযায়ী, কোনও পথকুকুরকে ‘হিংস্র’ বা ‘বিপজ্জনক’ বলে গণ্য করা হবে, তার জন্য সুনির্দিষ্ট মাপকাঠি রাখা হয়েছে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যদি কোনও পথকুকুর উস্কানি ছাড়াই কোনও মানুষকে আক্রমণ করে এবং কামড়ায় অথবা কারণ ছাড়া দু’টির বেশি গবাদি পশু বা অন্য প্রাণীকে আক্রমণ করে, তবেই সেটিকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এ ছাড়া কেবল সাধারণ মানুষের মৌখিক বা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই যাতে কোনও কুকুরকে মেরে ফেলা না হয়, তার জন্য কড়া নিয়ম প্রস্তাব করা হয়েছে।

    SOP-তে ইউথেনেশিয়ার পদ্ধতিও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। শুধুমাত্র যোগ্য পশুচিকিৎসক এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। এর জন্য সোডিয়াম পেন্টোবারবিটাল (sodium pentobarbital) অথবা থায়োপেন্টাল সোডিয়াম (thiopental sodium) নির্দিষ্ট ভাবে শিরায় প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছে, যাতে প্রাণীটির অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা না হয়।

    কোন জায়গা থেকে কুকুরটিকে উদ্ধার করা হয়েছে, কেন তাকে ইউথেনেশিয়ার আওতায় আনা হচ্ছে এবং সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী—প্রতিটি তথ্য স্পষ্ট ভাবে নথিভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফেও। পরে এই সমস্ত রেকর্ড রাজ্যস্তরের একটি কমিটি পরীক্ষা ও অডিট করবে। নিয়ম মেনে এবং সৎ উদ্দেশ্যে দায়িত্ব পালনকারী আধিকারিকদেরও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী আইনি সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

    পথকুকুরের আক্রমণ ও রেবিস নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি প্রাণীকল্যাণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন SOP-তে জননিরাপত্তা এবং পশুর প্রতি মানবিক আচরণ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কেরালা সরকারের এই পদক্ষেপে রাজ্যে পথকুকুর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ বাস্তবায়নের পথ আরও স্পষ্ট হলো। তবে এই বিষয়ে ইন্ডিয়ান ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের (Indian Veterinary Association) রাজ্য সভাপতি ভি কে পি মোহনকুমার জানান, সুপ্রিম কোর্ট কেবল বিশেষ কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতেই ইউথেনেশিয়া বা মার্সি কিলিংয়ের অনুমতি দিয়েছে। ফলে জলাতঙ্কগ্রস্ত, নিরাময়হীন রোগে আক্রান্ত এবং বিপজ্জনক কুকুরদের একই প্রোটোকলের অধীনে এনে বিচার করা যায় না। কোন কুকুর এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসবে তা নির্ধারণের জন্য স্পষ্ট ও স্বচ্ছ পদ্ধতি প্রয়োজন। এই মর্মে পশু চিকিৎসকদের প্রতিনিধি দল স্থানীয় স্বশাসন বিভাগের প্রিন্সিপ্যাল ডিরেক্টরের সঙ্গে দেখা করে নিজেদের প্রস্তাব পেশ করেছেন।

    ১. কেরালায় কেন পথকুকুরের ইউথেনেশিয়ার জন্য SOP জারি করা হয়েছে?

    বিপজ্জনক, রেবিস আক্রান্ত বা দুরারোগ্য অসুস্থ পথকুকুরের ক্ষেত্রে ইউথেনেশিয়া প্রক্রিয়ায় যাতে নিয়ম মেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং অপব্যবহার না ঘটে, সেই উদ্দেশ্যে কেরালা সরকার বিস্তারিত SOP তৈরি করেছে।

    ২. কোন পথকুকুরকে ইউথেনেশিয়ার আওতায় আনা হতে পারে?

    নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, রেবিসে আক্রান্ত, দুরারোগ্য রোগে ভুগছে অথবা মানুষের জন্য বিপজ্জনক বলে প্রমাণিত পথকুকুরকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ইউথেনেশিয়ার আওতায় আনা যেতে পারে।

    ৩. কোনও পথকুকুরকে বিপজ্জনক হিসেবে কীভাবে চিহ্নিত করা হবে?

    শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও কুকুরকে বিপজ্জনক ঘোষণা করা যাবে না। SOP-তে নির্দিষ্ট মাপকাঠি রাখা হয়েছে। যেমন, উস্কানি ছাড়া মানুষকে আক্রমণ ও কামড়ানো অথবা কারণ ছাড়া একাধিক গবাদি পশু বা অন্য প্রাণীকে আক্রমণ করার মতো আচরণ বিবেচনা করা হবে।

    ৪. পথকুকুরকে ইউথেনেশিয়ার সিদ্ধান্ত কে নেবে?

    স্থানীয় প্রশাসন বা কোনও একক আধিকারিক সরাসরি এই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। স্থানীয় স্তরের পথকুকুর ম্যানেজমেন্ট কমিটি প্রতিটি ঘটনা খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবে।

    ৫. ইউথেনেশিয়া কে করতে পারবেন?

    শুধুমাত্র যোগ্য ও প্রশিক্ষিত পশুচিকিৎসক নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন।

    ৬. ইউথেনেশিয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের ওষুধ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে?

    SOP-তে সোডিয়াম পেন্টোবারবিটাল অথবা থায়োপেন্টাল সোডিয়াম নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে প্রয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে প্রাণীটির অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রণা কমানো যায়।

    ৭. প্রতিটি ইউথেনেশিয়ার ঘটনা কি নথিভুক্ত করতে হবে?

    হ্যাঁ। কোথা থেকে কুকুরটিকে উদ্ধার করা হয়েছে, কেন ইউথেনেশিয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তার ভিত্তি কী—এই সমস্ত তথ্য নথিভুক্ত করতে হবে। পরে রাজ্যস্তরের কমিটি সেই নথি পরীক্ষা ও অডিট করবে।

    ৮. কেরালার নতুন SOP কি নির্বিচারে পথকুকুর হত্যার অনুমতি দেয়?

    না। নির্দেশিকায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও মাপকাঠির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও কুকুরকে ইউথেনেশিয়া করা যাবে না।

    ৯. পশু চিকিৎসকদের সংগঠন কি SOP নিয়ে কোনও আপত্তি জানিয়েছে?

    ইন্ডিয়ান ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের কেরালা শাখার সভাপতি ভি কে পি মোহনকুমার জানিয়েছেন, রেবিস আক্রান্ত, দুরারোগ্য অসুস্থ এবং বিপজ্জনক কুকুরকে একই প্রোটোকলের আওতায় না এনে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সংগঠনের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে স্থানীয় স্বশাসন বিভাগের প্রিন্সিপ্যাল ডিরেক্টরের কাছে প্রস্তাবও দিয়েছেন।

  • Link to this news (এই সময়)