শুঁটকি বললেই অনেকে নাক সিঁটকোন। বাবা রে বাবা, যা গন্ধ! অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার জোগাড়। কিন্তু ভোজন রসিকরা জানেন, এর স্বাদ। কষিয়ে রাঁধলে নাকি মুর্গ মুসল্লমও ফেল। একেবারে হাত চেটে খেতে হবে। কিন্তু সেই দিন আর নেই। শুঁটকির চাহিদায় ক্রমশই ভাঁটা পড়ছে। কেন? একচক্কর ঘুরে আসা যাক পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন অঞ্চল। উত্তরটা পাওয়া যাবে।
সারি সারি বাঁশের মাচা। তার উপর বিছিয়ে রাখা মাছ। কোথাও চিংড়ি, কোথাও ভোলা, কোথাও পাটিয়া, তাপড়া, অমুদি। উপুড় হয়ে রোদে শুকোচ্ছে। পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘা, জুনপুট, বাঁকিপুট, মন্দারমণির বড় চেনা দৃশ্য। সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় দোল খাচ্ছে বিকট পচা গন্ধ। অথচ স্বাদের কথা ভেবে জিভে জল আসতেও ছাড়ছে না। তবে ক্রেতারা আর সে ভাবে হাত বাড়াচ্ছেন না শুঁটকির দিকে। তার উপরে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মাছ শুকোতে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ। সব মিলিয়ে পূর্ব মেদিনীপুরের বহু প্রজন্মের পুরোনো শুঁটকি ব্যবসায় এখন যেন মন্দার কালো ছায়া।
সমুদ্রঘেঁষা জনপদগুলিতে শুঁটকির পচা গন্ধই অন্ন জোগায় বহু পরিবারকে। সমুদ্র থেকে মাছ ধরে আনেন মৎস্যজীবীরা। সেই মাছ কিনে নেয় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দল। তার পরে শুরু হয় আসল কাজ। বাছাই, কাটা, ধোয়া, মাচায় বিছিয়ে দেওয়া, রোদে শুকোনো, উল্টো করে আবার শুকোনো। এক-দু’দিনের কাজ নয়। আবহাওয়া বুঝে, রোদ বুঝে, মাছের ধরন বুঝে দিনের পর দিন ধরে চলে সেই প্রক্রিয়া। শেষে তৈরি হয় শুঁটকি।
শুঁটকি হলো উপকূলের অর্থনীতির শুকনো সোনা। কিন্তু এখন নিছক সোনালি রাংতা হয়েই রয়ে গিয়েছে। কেন? স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতি বছর ৩০-৪০ গাড়ি শুঁটকি ভিনরাজ্য, এমনকী বিদেশেও পাড়ি দিত। এখন বেশিরভাগই গোডাউনে পড়ে পড়ে পচছে। চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত কোনও মতে ৮ থেকে ১০ গাড়ি রপ্তানি হয়েছে। তা-ও বহু কাঠখড় পুড়িয়ে।
চিংড়ি, পাটিয়া, ভোলা, তাপড়া মাছের শুঁটকির চাহিদা প্রায় সারা বছরই থাকে। মন্দারমণির এক ব্যবসায়ী জানালেন, এখনও কিছু শুঁটকি উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি, ধূপগুড়ি আর অসমে যাচ্ছে। ভোলা, অমুদির মতো মাছের শুঁটকিই বেশি। কিন্তু সেই চাহিদা আর নেই। মৎস্যজীবী সংগঠনগুলির দাবি, ব্যবসায় টান পড়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি মৎস্যজীবী ও তাঁদের পরিবার।
কেন্দ্রীয় সরকার ও বাণিজ্য মন্ত্রকের যে রিপোর্ট সামনে এসেছে, সেটা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতোই। ২০২৩-এর এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪০০০.০৯ মেট্রিক টন শুঁটকি রপ্তানি হয়েছিল। যার বাজারদর ছিল প্রায় ৮,৫০০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে দেশে প্রায় ১৬ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রপ্তানির পরিমাণও ছিল কয়েক হাজার মেট্রিক টন।
বর্তমানে দাম পড়ে গিয়েছে ব্যাপক। পূর্ব মেদিনীপুর মৎস্যজীবী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক দেবাশিস শাসমলের আক্ষেপ, ‘এক সময়ে ঘগুয়া শুঁটকি ১০০-১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতো। এখন দাম নেমে এসেছে ৬০-৭০ টাকায়।’ পোলট্রির খাবার তৈরিতে শুঁটকির গুঁড়ো ব্যবহার হয়। সেই শুঁটকির দামও এক সময়ে ৩০-৩২ টাকা কেজি ছিল। এখন ১৫ টাকা কেজিতে গিয়ে ঠেকেছে।
এর কারণ চাহিদা নেই। তার সঙ্গে বেড়েছে উৎপাদন খরচও। শুঁটকি প্রস্তুতকারক অনুকূল ভূঁইয়ার কথায়, ‘মাছ কেনা থেকে শুরু করে শ্রমিকের মজুরি — সব কিছুর খরচই বেড়েছে। প্রয়োজন মতো শ্রমিকও পাওয়া যায় না। ফলে এই ব্যবসা আর কত দিন চালিয়ে যেতে পারব, তা নিয়েই মাঝে মধ্যে দুশ্চিন্তা হয়।’ রপ্তানির বাজারেও একই ছবি। এক সময়ে ওডিশা, ঝাড়খণ্ড, অসম, ত্রিপুরা-সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এবং বাংলাদেশেও পূর্ব মেদিনীপুরের শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা ছিল। রপ্তানিকারক তপন জানা বলছেন, ‘এখন পরিবহণ খরচ বেড়েছে। চাহিদাও নেই। ফলে রপ্তানিও কমেছে।’
মন্দার ক্ষতে আরও নুন ছড়িয়ে দিয়েছে শুঁটকি শুকোনোয় বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ। সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ হলো শুঁটকি তৈরির আদর্শ সময়। কিন্তু পূর্ব মেদিনীপুর মৎস্যজীবী ফোরামের অভিযোগ, কেউ কেউ নিয়মের বাইরে গিয়ে সারা বছর শুঁটকি তৈরি করেন। আর সেই করতে গিয়েই অসাধু ব্যবসায়ীদের একাংশ বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ। ফলে গুণমান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। কমছে চাহিদা।
যদিও এই অভিযোগ মানতে নারাজ মৎস্য দপ্তরের আধিকারিকরা। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সহ মৎস্য অধিকর্তা (সামুদ্রিক) সুমন সাহার বক্তব্য, ‘অনেকে মাছ মজুত করে রাখেন। পরে রোদ উঠলে শুকিয়ে শুঁটকি করেন। রাসায়নিক যাতে কেউ ব্যবহার না করেন, তার জন্য নজরদারি চালানো হয়।’ তাঁর দাবি, শুঁটকির উৎপাদন সরাসরি সমুদ্র থেকে মাছ ওঠার পরিমাণের উপর নির্ভরশীল। গত বছর সমুদ্র থেকে মাছ কম ওঠায় শুঁটকিও কম তৈরি হয়েছে।
শুঁটকির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মন্দারমণির দাদনপাত্রবাড়ে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির পরিকল্পনা করেছে রাজ্য সরকার। জমি অধিগ্রহণ হলে সেই এলাকার শুঁটকি তৈরির পরিকাঠামো কতটা টিকবে, তা নিয়েও আশঙ্কায় ব্যবসায়ীদের একাংশ।
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র দীনেন্দ্রনাথ রায় নাকি শুঁটকি খেতে খুব ভালোবাসতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ডাকতেন ‘বড়দাদা’ বলে। দীনেন্দ্রনাথের শুঁটকি প্রীতির গল্প সাতকাহন করে লিখে গিয়েছেন লীলা মজুমদার, ‘খেতে বসে আমরা ভাত চাপা দিয়ে শুঁটকি মাছ লুকোই। আর দিনদা নিজে পায়েস খাবার পরেও আর এক গ্রাস শুঁটকি খেয়ে মুখশুদ্ধি করলেন।’ শুঁটকির সেই ‘পুরোনো বাজার’ আবার ফিরবে? দিন বদলের স্বপ্ন দেখা ছাড়ছেন না মৎস্য ব্যবসায়ীরা।