শুধু প্রথাগত শিক্ষাই নয়, আঞ্চলিক ভাষা এবং সংস্কৃতির পঠন-পাঠনের উপরে জোর। পটচিত্রের মাধ্যমে বিষয়কে পড়ুয়াদের কাছে সহজলভ্য করে তোলা, পাশাপাশি ‘ডিজিটাল হাব’ তৈরি করে আধুনিক শিক্ষা প্রদান। ছক ভাঙা শিক্ষায় গড়ে তুলছেন পড়ুয়াদের। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে শান্তনু স্যর-ই আদর্শ। ঝাড়গ্রামের সেই শিক্ষক পাচ্ছেন জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার।
ঝাড়গ্রামের প্রত্যন্ত নয়াগ্রাম ব্লকের গভর্নমেন্ট মডেল স্কুলের ভূগোলের শিক্ষক শান্তনু পাত্র। ৫ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার’ তাঁর হাতে তুলে দেবেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। শান্তনুর জাতীয় শিক্ষকের পুরস্কার পাওয়ায় খুশি স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে পড়ুয়ারা। শনিবার স্কুলের তরফ থেকে এক ছোট্ট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্বর্ধনা জানানো হয় তাঁকে।
হাতে-কলমে শিক্ষার জন্য পড়ুয়াদের নিয়ে প্রকৃতির মাঝেই পৌঁছে যেতেন শান্তনু। পরিবেশ রক্ষা, বন্যপ্রাণ রক্ষা, ভূমিক্ষয় রোধ এই সব বুঝিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি প্রাচীন কোনও স্থাপত্য বা মন্দিরে গঠন প্রণালী এবং কোন পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে তাও বুঝিয়ে দিতেন পড়ুয়াদের। সেই বিষয়ে তিনি পরীক্ষাও নিতেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন পাঠ্যসূচির কড়া ভাষার পরিবর্তে পড়ুয়াদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতিতে পঠন-পাঠন করালে তাঁরা সহজেই তা বুঝে নিচ্ছেন। তাই আঞ্চলিক ভাষা এবং সংস্কৃতির উপর জোর দিয়ে, পটচিত্রের মাধ্যমে জলবায়ুর পরিবর্তন অঙ্কন করে এবং পটচিত্রের গানের মাধ্যমে পড়ুয়াদের বোঝান তিনি। ঝুমুর, বাহা গানের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা, বন্যপ্রাণ রক্ষা পড়ুয়াদের কাছে তুলে ধরা হয়। যার অঙ্গ হয়ে ওঠে পড়ুয়ারা নিজেরাই।
প্রাচীন সংস্কৃতির পাশাপাশি পড়ুয়াদের আধুনিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন শান্তনু। কম্পিউটার কক্ষকে ‘ডিজিটাল হাব’ হিসেবে গড়ে তুলে সেখানে আধুনিক শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি পড়ুয়ারা কী শিখেছেন তা জানার জন্য ডিসকাশন প্ল্যাটফর্ম এবং ক্রিয়েশন সেন্টার গড়ে তুলেছেন। বৃক্ষরোপণ, জৈব সার তৈরির প্রশিক্ষণও পায় পড়ুয়ারা। নয়াগ্রামে প্রচুর পরিমাণে বাবুই ঘাস পাওয়া যায়। সেই বাবুই ঘাস এবং তাল পাতা থেকেও নানা সামগ্রী তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় স্কুলের পড়ুয়াদের।
এখানেই শেষ নয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি জানার জন্য দেশ ও বিদেশের নানা স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে কথোপকথনের সুযোগ করে দেওয়া হয়। অসম, গুজরাট এবং ঝাড়খণ্ডের একাধিক স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে স্কুলের পড়ুয়ারা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান করে। জাপানের টোকিও এলাকার একাধিক স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গেও আলাপ আলোচনা করেছে এই স্কুলের পড়ুয়ারা। শিক্ষকরা ইংরেজিতে তাঁদের কথা অনুবাদ করে পড়ুয়াদের সাহায্য করেন। তাঁদের মধ্যে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব। জাপানের বন্ধুরা তাদেরকে চিঠিও পাঠান। পড়ুয়াদের এই ছোট্ট বয়স থেকেই অন্য ভাষা সংস্কৃতি জানার প্রতি আগ্রহ গড়ে তোলার পিছনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন ভূগোলের শিক্ষক শান্তনু।
শান্তনুর বাড়ি হুগলি জেলার তারকেশ্বরে। তিনি বর্তমানে নয়াগ্রাম এলাকার খড়িকামাথানিতে ভাড়াবাড়িতে থাকেন। শ্যামপুর হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার পরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত হরিপালের বিবেকানন্দ মহাবিদ্যালয় থেকে ভূগোলের স্নাতক এবং পরে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেন তিনি। ২০১০ সালে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই রতনপুর এসসি পাল হাইস্কুলে ভূগোলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতার কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ২০১৫ সালে পিএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৭ সালের নয়াগ্রাম ব্লকের গভর্নমেন্ট মডেল স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক স্কুলের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সম্পাদকের দায়িত্বভার তুলে দেওয়া দেন শান্তনুর উপরে।
শান্তনু অবশ্য বলছেন, ‘স্কুলের শিক্ষক এবং ছাত্র-ছাত্রীদের উন্নত সহযোগিতায় আজ তাঁর এই সাফল্য। জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার থেকে যে আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায় তা ছাত্র-ছাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী খরচ করব।’ স্কুলের প্রধান শিক্ষক অনুপম রায় বলেন, ‘ওঁর সাফল্যে আমরা অত্যন্ত খুশি। পড়ুয়াদের সহজ পদ্ধতিতে পঠন-পাঠনের জন্য তিনি অনবরত চেষ্টা করে চলেছেন।’
রিপোর্টিং: বুদ্ধদেব বেরা
১. ঝাড়গ্রামের কোন শিক্ষক জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার পাচ্ছেন?
নয়াগ্রাম ব্লকের গভর্নমেন্ট মডেল স্কুলের ভূগোল শিক্ষক শান্তনু পাত্র জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার পাচ্ছেন।
২. শান্তনু পাত্র কীভাবে পড়ুয়াদের পড়ান?
প্রথাগত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে পটচিত্র, ঝুমুর ও বাহা গানের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় পড়ুয়াদের বোঝান তিনি। প্রকৃতির মাঝেও নিয়ে গিয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেন।
৩. শিক্ষায় আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন গুরুত্ব দেন শান্তনু?
তিনি লক্ষ্য করেন, পাঠ্যবইয়ের কঠিন ভাষার পরিবর্তে পড়ুয়াদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে বিষয় বোঝালে তাঁরা দ্রুত তা আয়ত্ত করতে পারে। তাই স্থানীয় সংস্কৃতিকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেছেন তিনি।
৪. ‘ডিজিটাল হাব’ কী?
শান্তনু পাত্র স্কুলের কম্পিউটার কক্ষকে ‘ডিজিটাল হাব’ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সেখানে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি পড়ুয়াদের শেখার বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সৃষ্টিশীল কাজের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
৫. কবে শান্তনু পাত্রের হাতে জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে?
৫ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁর হাতে জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার তুলে দেবেন।