নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: অবশেষে এফআইআর করল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ‘গেরুয়া তাণ্ডবে’র ৩৭ ঘণ্টা পর। ‘সারারাত তাণ্ডব’, হুমকি শেষে শুক্রবার অবশেষে ‘নরম’ হলেন যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায়। অবশেষে বিজেপি সরকারের একজন অন্তত মন্ত্রী মেনে নিলেন যাদবপুরের ‘অসম্মান’ হয়েছে। তিনি অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। আর সেই তাল কেটে এবং ‘দিমাগি নকশাল’ বিচ্ছিন্ন করার মোটা দাগের সুর বজায় রেখে আর এক মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ ফের দিলেন ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’-এর হুমকি। বললেন, ‘তৃণমূল ওখানে দেশবিরোধী পুষে রেখেছিল। আমাদের লোকেরা ওই সময় সার্জিকাল স্ট্রাইক করেছিল। সেদিন এসএফআই অফিস ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ওখানে দেশবিরোধী স্লোগান উঠলে আবার সার্জিকাল স্ট্রাইক হবে। ৬ মাস অপেক্ষা করুন। আরও অনেক কিছু উলটে পালটে যাবে।’ কিন্তু এই মহানগর, এই বাংলা এরপরও বুঝিয়ে দিল, ‘ফ্যাসিবাদী’ কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া তাদের রক্তে নেই। বিকালে বেরলো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের মিছিল। নির্দিষ্ট কোনো বাম দল নয়। সবাই। একসঙ্গে। মিশে গেল তারা নাগরিক সমাজের সঙ্গে। ব্যানারে বড়ো বড়ো করে এই মিছিল লিখল, ‘যাদবপুর দিচ্ছে ডাক, গেরুয়া সন্ত্রাস নিপাত যাক!’... ‘এই মাটিতে গেরুয়া ফ্যাসিস্টদের ঠাঁই নেই।’ হিংসার বিরুদ্ধে অহিংসার ডাক। অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে আহ্বান সহিষ্ণুতার। তাই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নন্দলাল বসুর করা যে এমব্লেম বৃহস্পতিবার এবিভিপির গুণধররা পায়ের নীচে ফেলে ভেঙেছিল, তা উপাচার্যের উপস্থিতিতে স্থাপন করা হল চার নম্বর গেটে।
উপাচার্য এদিন একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন যাদবপুর থানায়। পুলিশ জানিয়েছে, ওই অভিযোগপত্রে রয়েছে—বুধবার রাত সাড়ে ১২টার পর একদল বহিরাগত ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায়। উল্লেখ রয়েছে অরবিন্দ ভবনের উপর আক্রমণের কথা, বলপূর্বক মেইন হোস্টেলের গেট খোলার প্রসঙ্গও। উপাচার্যের অভিযোগ, সিসিক্যামেরা সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু জিনিসপত্র ভাঙা হয়েছে। পরের দিন দুপুরে এমব্লেম ভাঙার বিষয়টিও রয়েছে ওই অভিযোগপত্রে। এরপরই এফআইআর দায়ের করেছে যাদবপুর থানা। এছাড়াও বৃহস্পতিবার এবিভিপি ও বামেদের মিছিলকে কেন্দ্র করেও দু’টি এফআইআর হয়েছে। যাদবপুর থানা যেমন নড়েচড়ে বসেছে, তেমনই বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের থেকেও নানা মত ভেসে আসছে। ‘রাসবিহারী কেন্দ্রের বিধায়ক হিসাবে’ মন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বলছেন, ‘ছাত্র আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গে নতুন কিছু নয়। কিন্তু দুই গোষ্ঠীর মারপিট খুবই অনভিপ্রেত। যাদবপুরের এমব্লেম হয়তো সারানো যাবে। কিন্তু অসম্মান যে হয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। আমি বলি, গোটা বিষয়টা পড়ুয়াদের উপর ছেড়ে দিন।’ ‘হুমকি’দাত্রী শর্বরীদেবীও এদিন ‘শান্তিপূর্ণ’ থাকার কথা বলেন। দিলীপ ঘোষই এই পর্বে বেসুরো ছিলেন। তাঁকে অবশ্য জবাবও দিয়েছেন এসএফআইয়ের সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য। তাঁর কটাক্ষ, ‘উনি আগে শুভেন্দু অধিকারীকে সামলান। ওঁর নিজের দলেই তো গোয়াল ঘরে গুঁতোগুঁতি চলছে।’ তবে কলেজ স্ট্রিটে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে এদিন এবিভিপি ‘অশান্তি’ করতে গিয়েছিল বলে অভিযোগ বামেদের। এসএফআইয়ের রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে বলেন, ‘জনা তিরিশ বাঁদর জড়ো হয়েছিল প্রেসিডেন্সির গেটে। স্লোগান শুনে পালিয়েছে।’ তবে শান্তিপূর্ণ ছিল যাদবপুর থেকে ঢাকুরিয়া পর্যন্ত পড়ুয়াদের ডাকা নাগরিক মিছিল। ‘গেরুয়া সন্ত্রাস’-এর বিরুদ্ধে ক্ষমতার আস্ফালন নয়, তাঁরা দেখিয়েছেন বাম ঐক্য। এই মিছিলে অংশ নেয় কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদও। অন্যদিকে, এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা অরবিন্দ ভবনের সামনে প্রতিবাদে শামিল হন। এবিভিপির অভিযোগ, ওই অবস্থানের জন্য পরীক্ষায় সমস্যা হয়েছে। সেদিনের ঘটনার তদন্তের জন্য ৫ জনের কমিটি হয়েছে। চেয়ারম্যান শুভ শঙ্কর সরকার।