• জুড়োচ্ছে পাবদার ঝোল, লেহেঙ্গার পথ চেয়ে মেয়ে!
    এই সময় | ২১ আগস্ট ২০২৬
  • এই সময়: মা–বাবা–ভাইকে দমবন্ধ করে মেরেছে আগুন। আপাতত ঠাকুর্দা–ঠাকুমার কাছে রয়েছে বছর সাতেকের মহিমা। এরপর? কী হবে বালিকার? মঙ্গলবার রাতে মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে মারা গিয়েছেন বাবা দেবাশিস দত্ত ও মা আফসানা সরমিন। বেঁচে নেই চার বছরের ভাই স্বর্ণাশিসও। শুধু মহিমাই ভারতে আসেনি, বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় থেকে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচেছে। তবু যেন তার বেঁচে থাকাই প্রশ্নের মুখে। দেবাশিসের মা–বাবার বয়স হয়েছে, অসুস্থ। আগুনে মারা গিয়েছেন সরমিনের বাবা আর স্বামী–সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা মা আফরোজ়া পারভিন। দেবাশিসের থেকে ১৭ বছরের ছোট বোন তিথি দত্ত আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তার উপরে ডেঙ্গি হয়েছে তাঁর। থাকেন চাঁপাই নবাবগঞ্জে। তিথির স্বামী স্নেহাশিস চন্দ্র মিঠু বৃহস্পতিবার ফোনে বলেন, ‘স্ত্রীকে এখনও খবরটা দেওয়া হয়নি। কাল (আজ, শুক্রবার) ওকে নিয়ে কুষ্টিয়ায় যাব, তখন জানাব। দেবাশিস তো শুধু দাদা ছিলেন না, তিথিকে সন্তানের মতো পালন করেছেন, স্নেহ করেছেন। আমার নিজের দাদার থেকেও বড় কিছু ছিলেন উনি। এই ধাক্কা সামলানো খুব কঠিন। দাদা–বৌদির মেয়ে মহিমার থেকে আমার ছেলে এক বছরের বড়। মেয়েটা তো এখনও বুঝতেই পারছে না, কী হারাল, কাদের হারাল! ওর কী হবে? খুব ভালো স্কুলে পড়ে, মেধাবী ছাত্রী। শুধু পড়াশোনার জন্য মাসে ১০–১২ হাজার টাকা খরচ।’

    সত্যিই দেবাশিস–সরমিনের মেয়েটা এখনও বুঝে উঠতে পারেনি। স্থানীয় সাংবাদিকরা জানাচ্ছেন, কখনও সে মন খারাপ করছে, কখনও খেলছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা নাগাদ তার স্কুলের একদল শিক্ষক–শিক্ষিকা গিয়েছিলেন মহিমাদের কাছে। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তার পড়াশোনার খরচ বহন করার আশ্বাস দিয়েছেন ঠিকই, তবু পরিজনের দুশ্চিন্তা তো কাটে না।

    ‘দৈনিক আজকের আলো’–র কার্যনির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সঙ্গে আরও একাধিক সংবাদপত্র ও খবরের চ্যানেলে কাজ করতেন দেবাশিস। কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি আল মামুন সাগর, ‘দৈনিক আজকের আলো’র প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুল বারি, সংবাদপত্রটির সম্পাদক গাজী মাহবুব রহমান, প্রথম আলোর স্থানীয় প্রতিনিধি তৌহিদি হাসান–সহ পরিচিত সক্কলে তাঁকে শিক্ষিত, ভদ্র, সৎ, সজ্জন ও তুখোড় সাংবাদিকের শিরোপা দিচ্ছেন। সাগর বলেন, ‘দেবাশিসের মা-বাবার ওষুধের জন্যই মাসে ১০-১২ হাজার টাকা লাগে। এ বাদে অন্যান্য খরচ তো আছেই। ওঁর রোজগারেই সব চলত। এই মৃত্যু তো মূলত গাফিলতির কারণে। তাই পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে ভারতের স্থানীয় প্রশাসন এবং বাংলাদেশ সরকারকে এগিয়ে আসার আবেদন জানাচ্ছি।’

    মাহবুবের কথায়, ‘জন্ম দেওয়া সন্তানকে হারালেন ওর মা–বাবা। কিন্তু আমি যে কী হারালাম, সেটা আমিই জানি। আমার মেয়ে আমেরিকায় থাকে, ওখান থেকে যে কোনও দরকারে দেবার সঙ্গেই যোগাযোগ করত। উচ্চশিক্ষিত, ভালো রকম পরিচিত হওয়া সত্ত্বেও মানুষের প্রতি যে কতটা শ্রদ্ধাশীল ছিল, কথায় বোঝানো যাবে না। লাল–হলুদ নানা রঙের সাংবাদিকতার কথা শোনা যায় তো? ও কিন্তু ছিল একদম হোয়াইট জার্নালিস্ট। এমন মানুষ যেন বারবার জন্ম নেয়, এই দোয়া করি।’ দেবাশিসের পরিজনের পাশে সাধ্যমতো দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

    অকালমৃত সাংবাদিকের চিন্তাভাবনা যে ব্যতিক্রমী ছিল, সে ইঙ্গিত মেলে একটা ইচ্ছেয়। সহকর্মী–ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর পরে তাঁর দেহ যেন সমাধি দেওয়া হয়। বডি পোড়ানো হোক, এটা চাইতেন না তিনি। সে ব্যবস্থা করছেন তাঁর সহকর্মী–বন্ধুরা। কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনও। ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর তৌহিদ বিন হাসান বৃহস্পতিবার বলেন, ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তরফে ১ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। তবে ওঁর শেষ ইচ্ছে মতো দেহের সমাধি হবে, নাকি দাহ করা হবে, সে সিদ্ধান্ত পরিবারই নেবে। এ নিয়ে তো আমাদের কিছু বলার নেই। উনি একটা বিপদে পড়ে (চিকিৎসার জন্য) ছেলে–বৌকে নিয়ে ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন। তাঁদের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই অবস্থায় সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।’ সূত্রের খবর, সমাধির জায়গা চিহ্নিত করার ব্যাপারে পুরসভার সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন বন্ধুদের কেউ কেউ। তবু শেষ সিদ্ধান্ত নেবেন মা–বাবাই।

    বৃহস্পতিবার কলকাতায় পৌঁছেছেন সরমিনের জামাইবাবু ফিরোজ় হাসান। দেবাশিসের দুই আত্মীয় এ পার বাংলায় থাকেন, তাঁরা পৌঁছে যান বুধবার সন্ধেবেলাই। কলকাতায় বাংলাদেশ দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক) ওমর ফারুক আকন্দ জানান, আজ, শুক্রবার দুপুরের মধ্যে যাবতীয় ফর্ম্যালিটি মিটিয়ে কুষ্টিয়ার দিকে রওনা দিতে পারে দেহগুলি। পৌঁছবে সেই বাড়িতে, যেখানে সব জেনেও দেবাশিসের মা স্বপ্না দত্ত বিলাপ করছেন, ‘আমার দেবা কই গো? কখন আসবে? ওর জন্য পাবদা মাছ রান্না করে রাখসি।’ আর সাত বছরের মেয়ে অপেক্ষা করছে লেহেঙ্গা ও চকোলেটের জন্য। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে শেষ ফোনালাপে তাকে এটাই তো বলেছিলেন বাবা।

  • Link to this news (এই সময়)