দেবাশিস দাস
বহুতলটির সব বেআইনি নির্মাণ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল ছ’বছর আগে। কলকাতা পুরসভাই সেটা করেছিল। কিন্তু তার পরে, মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেল যে বাড়িতে, সেই বহুতলে আবার বেআইনি নির্মাণ শুরু হয় ধীরে ধীরে। সেই বেআইনি কাজ এই ছ’বছরে ধরা পড়েনি। মঙ্গলবার শেষ রাতে হোটেলে আগুন লেগে ৯ জনের মৃত্যুর পরে অবশ্য সেটা এখন ধরা পড়ে গিয়েছে। ২০২০ সালে একবার ভেঙে দেওয়ার পরেও বাড়িটির ভিতরে ও বাইরে নতুন করে বেআইনি নির্মাণ হয় বলে নজরে এসেছে কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের। স্থানীয় সূত্রের খবর, এক সময়ে বাড়িটি ছিল দোতলা, তার পরে গত কয়েক বছরে সেটি ধীরে ধীরে ছ’তলা বাড়ি হয়ে দাঁড়ায়।
ঠিক কোন কোন অংশে ওই অবৈধ নির্মাণ হয়েছে, কী ভাবেই বা সে সব হতে পারল, তা নিয়ে পুরসভার বিল্ডিং বিভাগ তদন্ত শুরু করতে চলেছে। ওই বিভাগের এক শীর্ষকর্তা বৃহস্পতিবার বলেন, ‘তদন্ত করে পুর কমিশনারের কাছে রিপোর্ট পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’ বুধবারের পরে বৃহস্পতিবার সকালেও পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের অফিসাররা অগ্নিদগ্ধ হোটেলটির বিভিন্ন ফ্লোর সরেজমিনে পরীক্ষা করে দেখেন। পুরসভার এক শীর্ষ অফিসারের বক্তব্য, ‘বেশ কিছু অনিয়ম ধরা পড়েছে। ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুনানিতেও ডাকা হতে পারে মালিকদের।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ওই ছ’তলা বাড়ির বিভিন্ন অংশ ধীরে ধীরে বাড়ানো হয়েছিল অবৈধ ভাবে। মাঝখানে, ২০২০ সালে একবার ভেঙে দেওয়ার পরে, আবার। ওই বাড়ি থেকে কলকাতা পুরসভার সদর কার্যালয়ের দূরত্ব মেরেকেটে ৬০০ মিটার। তার পরেও বছরের পর বছর ধরে বেআইনি নির্মাণ হতে পারল কী ভাবে? পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের এক অফিসারের বক্তব্য, ‘পুরসভার নজরদারি ছিল বলেই ২০২০ সালে ওই বাড়ির বিভিন্ন বেআইনি অংশ ভাঙা পড়েছিল।’ কিন্তু তার পরে ফের কী ভাবে বেআইনি নির্মাণ হলো? ওই অফিসার বলছেন, ‘এই ব্যাপারেই তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, বাড়ির যিনি মালিক, তাঁর কাছ থেকে ‘শিখা ইন’ হোটেলের মালিক তিনটি ঘর লিজে় নিয়েছিলেন বছর দশেক আগে। কালেদিনে ওই তিনটি ঘরের ভিতরে দেওয়াল তুলে ছ’টি ঘর করা হয়েছে। ওই বাড়ির পাশের বাড়ির অন্যতম মালিক পঙ্কজ মজুমদার বলছেন, ‘এ সব নিয়ে পুরসভার কাছে একাধিক বার অভিযোগ করা হয়েছিল। পুলিশ নিয়ে এসে পুরকর্মীরা বাড়ির বেআইনি অংশ ভেঙে দিয়ে ছিলেন। কিন্তু কিছু দিন পরে আবার বেআইনি নির্মাণ শুরু হয়।’ পড়শিরা জানাচ্ছেন, যে বাড়িতে ‘শিখা ইন’, সেটির থেকে পাশের বাড়ির ছাদের মাত্র চার আঙুলের ফাঁক।
প্রাথমিক তদন্তে পুরসভা জেনেছে, ওই বাড়িটিতে অন্তত ছ’টি হোটেল ও গেস্ট হাউস চলত। বাড়িটিতে রয়েছে একাধিক ল ফার্ম, পোশাকের গুদামও। মধ্য কলকাতার একাধিক বসতবাড়িকে বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের ওই বাড়িতেও একই ভাবে নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখছে পুরসভার বিল্ডিং বিভাগ। পুরসভা সূত্রের খবর, শুধু ‘শিখা ইন’–এর বাড়িটি নয়, ওই রাস্তা এবং মার্কুইস স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডে এ ধরনের বেআইনি নির্মাণ থাকা বাড়িগুলোর একটি তালিকা আলাদা ভাবে তৈরি করা হচ্ছে। বেআইনি নির্মাণ থাকার প্রমাণ মিললেই প্রতিটি বাড়ির ক্ষেত্রে কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং রুলস অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।