শাসকের চাপ! ঘুষকাণ্ডে ধৃতের বিরুদ্ধে মামলা তুলতে কোর্টে তদ্বির সরকারি কৌঁসুলির, জানেই না এসিবি
বর্তমান | ২০ আগস্ট ২০২৬
সুজিত ভৌমিক, কলকাতা: বছর দশেক আগের কথা। ঘোর তৃণমূল আমলে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আবগারি দপ্তরের এক শীর্ষ কর্তা। ১০ বছর পর, রাজ্যে পালাবদল হতে না হতেই সেই এক্সাইজ কর্তাকে বাঁচাতে আসরে নামল রাজ্যের নবগঠিত বিজেপি সরকার। অন্তত তেমনই অভিযোগ উঠছে। ব্যাঙ্কশাল কোর্টের এক বিশেষ সূত্র জানাচ্ছে, ওই এক্সাইজ কর্তার বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন রাজ্য সরকারের তরফে নবনির্বাচিত সরকারি আইনজীবী সজল পাল। রাজ্য দুর্নীতি দমন শাখার গোয়েন্দাদের অজান্তেই তিনি এই কাজ করেছেন বলে অভিযোগ। এটাই কি শুভেন্দু সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি? উঠছে প্রশ্ন। সম্প্রতি একাধিক সরকারি আধিকারিক ঘুষ নিতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। সেই তালিকায় পুলিশকর্মীরাও রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বিজেপি সরকার নিযুক্ত সরকারি আইনজীবীর এহেন ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে দুর্নীতি দমন শাখার গোয়েন্দা মহলে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ-প্রশাসন মুখে কুলুপ এঁটেছে।
সময়টা ২০১৬ সাল। দমদমের এক ব্যবসায়ীকে বারের লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার জন্য প্রথমে ১৬ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন অ্যাডিশনাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট সন্দীপকুমার রায়। দরাদরির পর অবশ্য ঘুষের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ১ লাখে। কিন্তু সন্দীপবাবুর কপালটাই খারাপ! সেই ১ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় রাজ্য দুর্নীতি দমন শাখার গোয়েন্দাদের পাতা ফাঁদে ধরা পড়ে যান। ইতিমধ্যেই এই মামলায় তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযুক্ত এক্সাইজ কর্তার বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করেছেন দুর্নীতি দমন শাখার গোয়েন্দারা। যে কোনো দিন মামলার বিচারপর্ব শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসতেই নাটকীয়ভাবে গোটা পরিস্থিতি বদলে যায়। সরকারি আইনজীবী সজল পাল দুর্নীতি দমন শাখার কর্তাদের অজান্তেই ৩২১ সিআরপিসি ধারা কাজে লাগিয়ে ওই মামলা তুলে নিতে আদলতের দ্বারস্থ হন বলে কোর্ট সূত্রে খবর। বিষয়টি জানাজানি হতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে দুর্নীতি দমন শাখায়। ক্ষিপ্ত গোয়েন্দাদের একাংশের অভিযোগ, ‘১৫ হাজার টাকা ঘুষ নিতে গিয়ে ব্যাঁটরা থানার এসআই গ্রেপ্তার হয়েছে। তাহলে এক লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া ওই এক্সাইজ কর্তাকেই বা কেন ছাড় দেওয়া হবে?’
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যে ঘুষমুক্ত স্বচ্ছ প্রশাসন গড়ার কথা বুক ঠুকে ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই কারণেই তৃণমূল আমলে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া দুর্নীতি দমন শাখাকে ঢেলে সাজার সিদ্ধান্ত নেন। রাজ্য পুলিশের আইবি থেকে আইজি মুরলীধর শর্মা, ডিআইজি আকাশ মাঘারিয়া এবং এসপি কামনাশিস সেনকে রাতারাতি ডেপুটেশনে এই দুর্নীতি দমন শাখায় নিয়ে আসেন। তারপরই রাজ্যজুড়ে শুরু হয় ধরপাকড়। এমনকি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং দুর্নাীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রমাণ হিসাবে একাধিক জনসভায় দুর্নীতি দমন শাখার অভিযানের কথা ফলাও করে ঘোষণাও করেছেন। অথচ তাঁর সরকারের নিযুক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এবার ঘুষকাণ্ডে ধৃত অফিসারের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে উদ্যত! ফলে দুর্নীতি দমনে রাজ্য সরকারের অভিপ্রায় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।