• ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত আসানসোল, বিপদে বাঁকুড়া-পুরুলিয়াও
    এই সময় | ১৯ আগস্ট ২০২৬
  • এই সময়: নিম্নচাপের জেরে টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা। পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল মহকুমা, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলায় প্লাবন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও ব্যতিক্রম কেবল দুর্গাপুর। জল জমেছে পূর্ব বর্ধমানের কিছু এলাকায়। সর্বত্রই নদী ও জোড় উপচে একের পর এক কজ়ওয়ে তলিয়ে গিয়েছে জলের তলায়। বহু ঘরবাড়ি জলমগ্ন এবং উদ্ধারকার্যে নামাতে হয়েছে রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ও অসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনীকে। জলবন্দি মানুষকে উদ্ধারে ব্যবহার করা হয়েছে স্পিডবোট। খোলা হয়েছে একাধিক ত্রাণ শিবির। এই পরিস্থিতিতে দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকে বেশি হারে জল ছাড়া শুরু হওয়ায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

    টানা ২৪ ঘণ্টার অঝোর বৃষ্টিতে চরম বিপাকে পড়েছেন আসানসোল শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দারা। সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ে রাত সাড়ে ১১টার পরে। টানা চার ঘণ্টার মুষলধারে বৃষ্টিতে আসানসোলের গারুই ও নুনিয়া নদী ফুলে-ফেঁপে ওঠে। এর ফলে আসানসোল রেলপার এলাকার পাঁচটি ওয়ার্ড পুরোপুরি জলমগ্ন হয়ে পড়ে এবং গারুই নদীর দুই তীরে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাতের অন্ধকারেই বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেন। প্রতিবেশীরাই প্রাথমিক ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করেন। মঙ্গলবার সকালে রেলপার এলাকায় দেখা যায়, কয়েক স্থানে প্রায় ছয় ফুট উচ্চতায় জল বইছে। বাসিন্দারা জীবন বাজি রেখে ঘর থেকে জিনিসপত্র বের করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা পিন্টু কুমার বলেন, ‘নদী সংস্কার করে নাব্যতা না বাড়ালে বছর বছর এই দুর্ভোগ হবে।’

    পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে পশ্চিম বর্ধমান জেলা প্রশাসনের নির্দেশে এলাকায় নামানো হয় অসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তর ও এসডিআরএফের দল। স্পিডবোটে উদ্ধার পাওয়া ঝন্টু দাস বলেন, ‘বাড়িতে একবুক জল জমেছে। প্রশাসনের পাঠানো স্পিডবোটে করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছেছি।’ পুর প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, একাধিক স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে অস্থায়ী ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে। সেখানে খাবার, পানীয় জল ও পোশাকের ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন। দিনরাত এক করে নিকাশি ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার কাজ চালাচ্ছেন সাফাই কর্মীরা। আসানসোলের পুর কমিশনার দিলীপ মিশ্র জানান, ‘জেলা প্রশাসনের সঙ্গে লাগাতার বৈঠক করে জলবন্দিদের উদ্ধার ও এলাকার নিকাশি ব্যবস্থা চালানো হচ্ছে।’

    আসানসোলের শহরতলি এলাকাতেও পরিস্থিতি সঙ্কটজনক। সীতারামপুরে একটি বড় খালে জলোচ্ছ্বাসের কারণে কালভার্টের কার্নিশ ভেঙে পড়ে। ওই সময়ে আসানসোলের কর্মস্থল থেকে স্কুটারে চেপে বাড়ি ফিরছিলেন দু’জন। জলের তোড়ে দু’জনেই ভেসে যান। কোনও ক্রমে গাছের ডাল ধরে বেঁচেছেন রাজীব পাসোয়ান। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না আমির গিয়াসির। দু’জনের বাড়ি সীতারামপুরে।

    অন্য দিকে, বারাবনির পাঁচগাছিয়া ও গান্ধীনগরের একাধিক বাড়ি জলের তলায় চলে গিয়েছে। একটি কাঁচা বাড়ি ভেঙে পড়লেও সৌভাগ্যবশত কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। বাড়ির মালিক সগু সাও জানান, প্রবল বৃষ্টিতে হঠাৎ করে তাঁর বাড়ির একাংশ ভেঙে পড়ে। তবে বরাতজোরে সবাই বেঁচে গিয়েছেন। পাশাপাশি আসানসোল পুরসভার ৬১ নম্বর ওয়ার্ডের কুলটি নিয়ামতপুরের প্রিয়া কলোনি অঞ্চলেও নিকাশি নালা উপচে নোংরা জল ঘরে ঢুকে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে।

    টানা বৃষ্টিতে রানিগঞ্জের হারা লভাঙা সেতু দু’ফুট জলের তলায় চলে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বহু গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা। হারাভাঙা, তিরাট, ডামালিয়া, নিমচা কোলিয়ারি সমেত একাধিক গ্রামের হাজার হাজার মানুষ যাতায়াতের ক্ষেত্রে চরম বিপাকে পড়েছেন। দীর্ঘ দিন ধরে এই সেতু সংস্কারের দাবি জানালেও কোনো সুরাহা হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রামবাসীরা।

    বৃষ্টির মাঝেই মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটা নাগাদ রানিগঞ্জের বল্লভপুর পঞ্চায়েতের রঘুনাথচক দুষাদপাড়া এলাকায় ধস নামে। প্রায় ১০ বর্গফুট জমি ২০ ফুট গভীরে তলিয়ে যাওয়ায় এলাকায় ভয়াবহ আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রিটিশ আমলে এখানে অবৈজ্ঞানিক ভাবে কয়লা উত্তোলনের পর বালি ভরাট না করায় এই ধস নামছে। পাশেই ঘন জনবসতি, আইসিডিএস কেন্দ্র ও স্কুল থাকায় বড়সড় বিপদের আশঙ্কা করছেন তাঁরা। আপাতত এলাকাটি ব্যারিকেড করে রেখেছে পুলিশ।

    পুরো শিল্পাঞ্চল প্লাবিত হলেও সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা গিয়েছে দুর্গাপুরে। অতীতে সামান্য বৃষ্টিতেই বেনাচিতি বা ফুলঝোড় জলমগ্ন হলেও, এ বার শহরের কোথাও তেমন জল জমেনি। কয়েক বছর আগে ধান্ডাবাগ হয়ে তামলা নালা, ট্র্যাঙ্করোড থেকে ৫৪ ফুটের নিকাশি নালা এবং গোপালমাঠ থেকে জাতীয় সড়কের ধারের নালা সংস্কার করার ফলেই এই সাফল্য মিলেছে। দুর্গাপুর পুরসভার প্রাক্তন মেয়র পারিষদ প্রভাত চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘কেএমডিএ-র সহযোগিতায় দুর্গাপুরের নিকাশি ব্যবস্থা ঢেলে সাজা হয়।’ দুর্গাপুরের পশ্চিমের বিধায়ক লক্ষ্মণ ঘোড়ুই জানান, প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে দুর্গাপুর শহরের নিকাশি সমস্যা অনেকটাই সমাধান হয়ে যাবে।

    বৃষ্টির জেরে দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকে জল ছাড়ার পরিমাণ একধাক্কায় বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকে জল ছাড়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দুপুরে ৬৪,৩২৫ কিউসেক এবং সন্ধ্যায় তা ৮২,৪৭৫ কিউসেকে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য দিকে, ডিভিসির এগজ়িকিউটিভ ডিরেক্টর সুবীর সাহা বলেন, ‘এ দিন মাইথন থেকে জলবিদ্যুৎ তৈরিতে তিন হাজার কিউসেক এবং পাঞ্চেত থেকে ২৯ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে। পাঞ্চেত ও মাইথনে জল ধরে রাখার পর্যাপ্ত ক্ষমতা রয়েছে, তাই এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’

    বাঁকুড়া জেলাতেও টানা বৃষ্টিতে নদনদীর জলস্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। গন্ধেশ্বরী নদীর জল উপচে বাঁকুড়া-২ ব্লকের মানকানালি সেতু ডুবে যাওয়ায় প্রায় সাত একর কৃষিজমি জলমগ্ন হয়েছে। সোমবার রাতে ওই সেতু পেরোতে গিয়ে একটি রড বোঝাই ট্রেলার জলের স্রোতে কাত হয়ে গেলেও চালক ও খালাসি রক্ষা পেয়েছেন। মীনাপুর কজ়ওয়ে এবং ছাতনা-শুশুনিয়া রাস্তার কজ়ওয়েও এখন জলের তলায়। সোমবার সন্ধ্যায় মুকুটমণিপুরের কংসাবতী জলাধার থেকে পাঁচ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে। মঙ্গলবার বিষ্ণুপুর থানার ভড়া গ্রামে এক বাসিন্দার মাটির বাড়ির দেওয়াল ধসে পড়ে। তবে কেউ হতাহত হননি।

    সোম থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত বাঁকুড়ায় ৭৩.৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সোনামুখীর চকাই কালভার্টের উপর দিয়ে জল বইতে থাকায় ১০-১২টি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন। চকাইয়ের বাসিন্দা রাজু শেখ বলেন, ‘এটা সোনামুখীর ধূলাই, রামপুর, পখন্না হয়ে বড়জোড়া যাওয়ার মেন টি-পয়েন্ট। মাঠে মাঠে জল চলে আসায় ধান জমি ডুবে গিয়েছে।’ গ্রামবাসী প্রহ্লাদ বাগদি অভিযোগ করেন, ‘নালা দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় পলি জমে বুজে গিয়েছে, তাই এই অবস্থা।’ অন্য দিকে, ছাতনা-মেজিয়া রাজ্য সড়কের মাতাবেল কজ়ওয়ের উপর দিয়েও প্রবল বেগে জল বইছে। সেখানে স্থায়ী উঁচু সেতুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা তুফান ঘোষ।

    পুরুলিয়ার সাঁতুড়িতে সোমবার থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২১৩.৬ মিলিমিটার রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে জেলার বহু কজওয়ে ও সেতু ডুবে যায়। সাঁতুড়ির বিশ্রাম জোড়ে এবং বরাবাজারের কুমারী নদীর কজওয়ে পার হতে গিয়ে বাইক সহ ভেসে যান দুই ব্যক্তি। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত জলে নেমে তাঁদের উদ্ধার করেন।

    নিতুড়িয়ার আলকুশা গ্রামে জল ঢুকে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ পরিদর্শন করেন রঘুনাথপুরের বিধায়ক মামনি বাউরি। এছাড়া কাশীপুর-বাঁকুড়া সড়কের ডাঙ্গরা সেতু, পাতলুই নদী সেতু এবং সাহারজোড় সেতু সহ একাধিক যোগাযোগ ব্যবস্থা জলের তলায় চলে যাওয়ায় মনসা পুজোর দিনে চরম বিপাকে পড়েন মানুষজন।

    পুরুলিয়ায় বিভিন্ন এলাকায় কজ়ওয়ে ও সেতু জলের তলায় চলে যাওয়ায় ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। সাঁতুড়ির বিশ্রাম জোড়ে এবং বরাবাজারের কুমারী নদীর কজ়ওয়ে পার হতে গিয়ে তীব্র স্রোতে মোটরবাইক সমেত ভেসে যান দুই ব্যক্তি। স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতায় দু’জনকেই উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বরাবাজারের ঘটনায় বাইকটি মেলেনি। অতিরিক্ত বৃষ্টির জেরে নিতুড়িয়ার আলকুশা গ্রাম, সাঁতুড়ির কৃষ্ণপুর বাজার এবং আড়শার সটরা গ্রামের একাধিক বাড়ি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। নিকাশি নালা দখলের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে আলকুশায় যান রঘুনাথপুরের বিধায়ক মামনি বাউড়ি। বৃষ্টির ফলে ডাঙরা, পাতলুই ও টটকো নদী এবং সাহারজোড় সেতুর পাশাপাশি বহু কজ়ওয়ে তলিয়ে যাওয়ায় মনসাপুজোর দিন জেলা জুড়ে যাতায়াতে চরম ভোগান্তির শিকার হন সাধারণ মানুষ।

    পূর্ব বর্ধমানের কালনাতেও টানা বৃষ্টিতে শহরের কিছু এলাকা ও আনাজ চাষের জমি জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। জলমগ্ন হয়েছে কালনার বেশ কিছু এলাকার চাষের জমিও। বৃষ্টির জেরে আনাজ চাষে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কিছু আনাজের দাম চড়তেও শুরু করেছে।

    অন্য দিকে, টানা বৃষ্টিতে জল জমেছে কাটোয়া ও দাঁইহাট শহরে একাধিক ওয়ার্ডে। কাটোয়া শহরের ফরিদপুর কলোনি, পাবনা কলোনি, হাজরাপুর কলোনি এলাকার একাংশ রাস্তা জলমগ্ন হয়েছে। ১১ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ডের বেশ কয়েকটি বাড়িতে জল ঢুকে গিয়েছে। দাঁইহাটের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের নন্দিবাগান এলাকার কাছে স্কুল রোড এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। সংকীর্ণ নিকাশি নালার কারণেই বৃষ্টিতে জল জমে ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাসিন্দারা।

  • Link to this news (এই সময়)