মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন মিস পুনে খেতাবজয়ী ত্বিষা শর্মা (৩৪)। রাজস্থানের নাসিরাবাদ যাওয়ার ট্রেনের টিকিটও কেটে ফেলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি। ১২ মে রাতে ভোপালের বাড়ির ছাদ থেকে উদ্ধার হয় তাঁর দেহ। এই ঘটনায় স্বামী সমর্থ সিং এবং শাশুড়ি গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে সিবিআই। অভিযোগ, দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতনের জেরেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন ত্বিষা।
গত শুক্রবার ভোপাল আদালতে চার্জশিট পেশ করে সিবিআইয়ের। প্রায় সাড়ে ৬০০ পাতার সেই চার্জশিট অনুযায়ী, মৃত্যুর রাতে ৯টা ৩৬ মিনিটে ননদ রাশি আব্রোলকে হোয়াটসঅ্যাপে ত্বিষা লিখেছিলেন, ‘ওকে বলো, স্ত্রীর অবশিষ্টাংশ নিয়ে যেতে। তবে কাল। এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’ চার মিনিট পরে সিসিটিভিতে তাঁকে একা ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়। রাত ৯টা ৪১-এ বাবাকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে জানান, স্বামী সমর্থ অত্যন্ত ‘আক্রমণাত্মক ও হিংস্র’ হয়ে উঠেছেন। তাঁর ভয় লাগছে। রাত ১০টা ৫-এ মাকেও ফোন করেন।
সিবিআইয়ের দাবি, রাত ১০টা ২৩ মিনিটে সিসিটিভিতে সমর্থ ও তাঁর মা গিরিবালাকে ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়। পরে সমর্থ, তাঁর এক আত্মীয় ও কর্মী ত্বিষাকে নীচে নামিয়ে AIIMS-এ ভর্তি করেন। রাত ১০টা ৫৫-এ সেখানেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে অনলাইন ডেটিং অ্যাপে সমর্থের সঙ্গে পরিচয় হয় ত্বিষার। ৯ ডিসেম্বর বিয়ে। ত্বিষা আগে মডেল ছিলেন। ‘মিস পুনে’ খেতাব জিতেছেন। অভিনয়ও করেছেন। পরে কর্পোরেট সেক্টরে যোগ দেন। সিবিআইয়ের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই ত্বিষার অতীত নিয়ে খোঁটা দিতে শুরু করেন সমর্থ। চলে মানসিক নির্যাতন। ত্বিশা প্রতিবাদ করলে শাশুড়ি গিরিবালা ছেলের পক্ষই নিতেন।
১৬ এপ্রিল প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর জানতে পারেন ত্বিষা। ৬ মে গর্ভপাতের ওষুধের প্রথম ডোজ নেন। সিবিআইয়ের দাবি, গর্ভপাত করাতে রাজি ছিলেন না সমর্থ। শাশুড়ি গিরিবালা তাঁকে ‘খুনি’ বলেছিলেন বলেও ননদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন ত্বিষা। ৮ মে দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পর তিশার প্রচণ্ড ব্যথা ও রক্তপাত হয়। তাঁর অভিযোগ, সমর্থ বিষয়টিকে ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দেন। ৯ মে ত্বিশা তাঁর মাকে লেখেন, ‘আমার এখানে দম বন্ধ হয়ে আসছে।’ ননদকেও জানান, তিনি ভেঙে পড়েছেন। এই সম্পর্কের আর কোনও ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন না। সিবিআইয়ের দাবি, আগেও তিনি ‘মরে যাওয়া’ বা ‘উধাও হয়ে যাওয়ার’ কথা বলেছিলেন।
চার্জশিটে আর্থিক চাপের অভিযোগও রয়েছে। ত্বিষার ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে প্রায় ২০ লক্ষ টাকার বিনিয়োগ ছিল। সমর্থ ও গিরিবালা সেই টাকা ত্বিশা ও সমর্থের যৌথ অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের জন্য চাপ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। ত্বিশা রাজি হননি। তাঁর দাবি ছিল, টাকা তাঁর বাবার। মৃত্যুর দিন সন্ধ্যা ৭টা ৫১ মিনিটে ননদকে ফোন করে ত্বিষা অভিযোগ করেন, সমর্থ তাঁকে বিনিয়োগের টাকা চিনের শেয়ার বাজারে লাগানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন।
১২ মে সকালেই মায়ের কাছে ৩ হাজার টাকা চান ত্বিষা। রাজস্থানের নাসিরাবাদ যাওয়ার ট্রেনের টিকিট কাটেন। মাকে জানান, সম্পর্ক বাঁচানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সমর্থ দাম্পত্য কাউন্সেলিংয়ে যেতে চাইছেন না। পরে সমর্থ কাউন্সেলিংয়ে রাজি হন। সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ দু’জনে চিকিৎসক কাকলি রায়ের সঙ্গে দেখা করেন। চিকিৎসক সমর্থকে স্ত্রীর কথা ধৈর্য ধরে শোনার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি দু’জনকেই গাঁজা সেবন বন্ধ করতে বলেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে। সন্ধ্যায় ত্বিষা মাকে ফোন করে জানান, এই সম্পর্কে তিনি আর থাকতে চান না। তিনি ‘চিরদিনের জন্য’ ভোপাল ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই আসে সেই শেষ মেসেজ— ‘এখন আমাকে শান্তিতে মরতে দাও।’
ত্বিশার পরিবারের অভিযোগ ছিল, প্রথম ময়নাতদন্তের রিপোর্টে কারচুপি হয়েছে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের নির্দেশে দিল্লির AIIMS-এর মেডিক্যাল বোর্ড দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করে। সেই রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ফাঁস লাগার ফলে শ্বাসরোধ এবং মৃত্যুর ধরন হিসেবে আত্মহত্যা উল্লেখ করা হয়েছে। শরীরে হামলার কোনও চিহ্নও পাওয়া যায়নি। সিবিআইয়ের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতনের জেরেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন ত্বিষা।
সিবিআই ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৮৫, ১০৮ এবং ৩(৫) ধারায় সমর্থ ও গিরিবালার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে। তবে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। ত্বিষার আইফোনের ফরেনসিক রিপোর্ট, বাড়ির CCTV-এর DVR পরীক্ষা এবং অভিযুক্তদের কণ্ঠস্বরের ফরেনসিক রিপোর্ট এখনও বাকি। পণের দাবি ও সেই কারণে মৃত্যুর অভিযোগেও আলাদা ভাবে তদন্ত চালিয়ে যেতে চায় সিবিআই।
প্রশ্ন: ত্বিষা শর্মা কে ছিলেন?
উত্তর: ত্বিষা শর্মা ‘মিস পুনে’ খেতাবজয়ী এবং প্রাক্তন অভিনেতা-মডেল ছিলেন। পরে তিনি কর্পোরেট ক্ষেত্রে কাজ করেছিলেন।
প্রশ্ন: ত্বিষার মৃত্যু কবে হয়?
উত্তর: ২০২৬ সালের ১২ মে ভোপালে শ্বশুরবাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়। AIIMS ভোপালে রাত ১০টা ৫৫ মিনিট নাগাদ তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয় বলে চার্জশিটে উল্লেখ রয়েছে।
প্রশ্ন: CBI কাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে?
উত্তর: ত্বিষার স্বামী সমর্থ সিং এবং শাশুড়ি গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে মানসিক নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে চার্জশিট দিয়েছে CBI।
প্রশ্ন: কী কী ধারায় মামলা হয়েছে?
উত্তর: ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৮৫, ১০৮ এবং ৩(৫) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রশ্ন: CBI-এর তদন্ত কি শেষ?
উত্তর: চার্জশিট জমা পড়লেও পণের দাবি ও পণজনিত মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে আরও তদন্তের অনুমতি চেয়েছে CBI।