সুপ্রকাশ মণ্ডল
প্রকাশ্যে আপমানিত তাঁকে অনেকবার হতে হয়েছে। প্রকাশ্য মঞ্চে তাঁর দলের নেতারাই করেছেন। পাল্টা প্রতিবাদ বা প্রতি আক্রমণ তাঁর ধাতে ছিল না। কিন্তু চোর-তোলাবাজ কখনও শুনতে হয়নি। সেটাও শুনতে হয় গত ২১ জুলাই।
সে দিন ঋতব্রত-তৃমমূল শিবিরের শহিদ দিবসের কর্মসূচিতে যোগ দিতে কলকাতা আসার পথে অভ্যেসমতো বর্ধমানের শক্তিগড়ে চা খেতে দাঁড়িয়েছিলেন। পরিচিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে গাড়িতে ওঠার মুখে ঘটে সেই ঘটনা। এগিয়ে যান স্থানীয় বিজেপির নেতা সৌমিত্র ঘোষ। আচমকা একের পর এক প্রশ্ন এবং হুঁশিয়ারি, আর শেষে — ‘বয়স্ক না হলে চাবকে পিঠের ছাল তুলে নিতাম!’
না। কোনও কথা বলেননি পাঁচ বারের বিধায়ক, তিনটি দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী, রাজ্য বিধানসভার দু’বারের ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। পরে সেই ভিডিয়ো রামপুরহাট-সহ তাঁর এলাকায় ভাইরাল হয়ে পড়ে। এটা যদি শুরু হয়, তা হলে তারাপীঠ-রামপুরহাট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (টিআরডিএ) টাকা নয়ছয় নিয়ে নিজের এলাকায় ‘চোর’ অপবাদ শোনা ছিল রামপুরহাটের মাস্টারমশাইয়ের অবসাদের কফিনে শেষ পেরেক।
তাঁর মনের তল পাওয়া কঠিন। রাজনীতি বা পারিবারিক জীবনের সাধে কোথাও কোনও খাদ ছিল কি না, তা জানার আর উপায় নেই। ‘মাস্টারমশাই’ থেকে ‘চোর’ যে তাঁকে অবসাদের অতলে তলিয়ে দিয়েছিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই আশিসের পরিবারের। সেই অবসাদের কারণেই হয়তো এই সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। সুচিন্তিতই। নইলে ভোরবেলা স্নান সেরে পাটভাঙা পোশাক পরে কেনই বা আসবেন এক গাছা দড়ি হাতে বাড়ি লাগোয়া পার্টি অফিসে!
শেষ ২৫ বছর ধরে বিধায়ক। কিন্তু এলাকার বাসিন্দারা আশিসকে চেনেন ‘মাস্টারমশাই’ হিসেবে। রামপুরহাট কলেজে বাংলার অ্যাসোয়িয়েট প্রফেসর আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর ছাত্রছাত্রীরা মনে রাখতে চান সেই মানুষ হিসেবে, যিনি কর্মজীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাইকেলে করে যাতায়াত করেছেন। ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা অগণিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কুকথা দূরে থাক, কেউ মনে করতে পারেন না যে, তাঁদের স্যর কখনও কাউকে সামান্যতম কটু কথা বলেছেন।
সেই তিনি দুর্নীতি তোলাবাজির সঙ্গে যুক্ত, তা বিশ্বাসই করেন না তাঁরা। তাঁদেরই এক জন সুখেন পাল। তিনি বলেন, ‘আমি স্যরের বাড়িতে যেতাম টিউশন নেওয়ার জন্য। টাকা নিতেন না। আমার মতো অনেককেই বিনা ফি-তে পড়াতেন বাড়িতে।’ শক্তিগড়ের ঘটনার পরে পরেই আশিসের কথা হয়েছিল সুখেনের সঙ্গে। তখন বলেছিলেন, ‘এটা তো আমাদের প্রাপ্যই ছিল। আমাদের দলের লোকেরা যা করেছে, তাতে মানুষ রাস্তাঘাটে তো বলবেই।’
সেই ভিডিয়ো এলাকায় ছড়িয়ে যেতেই নিজেকে গুটিয়ে নেন আশিস। এলাকায় লোকজন সে সব নিয়ে কথা বলছে জেনে আর বাড়ি থেকে বিশেষ বেরোতেন না। তবে গত বিধানসভা ভোটের আগে দেওয়াল লিখন কি কিছুটা হলেও পড়তে পেরেছিলেন? ভোটের ঠিক আগে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন একটি অনুষ্ঠানে। ভোটের ফল নিয়ে সেখানে এক ছাত্রের প্রশ্নে আশিস বলেছিলেন— ‘মানুষ খুব ভালো ভাবে নিচ্ছে না। দলের নেতাদের িনয়ে খারাপ কথা বলছে। অন্য রকম কিছুও হতে পারে। হয়তো খুব কম ভোটে জিতে যাব।’
জিততে পারেননি। তাঁর দল তৃণমূলও ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বিজেপি ক্ষমতায় এসে খুলেছে টিআরডিএ ফাইলস। এই সংস্থার চেয়ারপার্সন ছিলেন আশিস। বেশ কিছু দিন রামপুরহাটে চর্চায় ছিল টিআরডিএ-তে ১০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ। আশিস তাঁর শেষ নোটে লিখেছেন — তিনি টিআরডিএ-র চেয়ারপার্সন থাকলেও চেক সই থেকে টেন্ডারের ছাড়পত্র, কিছুতেই তাঁর হাত ছিল না। তার পরেও এলাকায় তাঁেক শুনতে হচ্ছিল— চোর, তোলাবাজ। জেলযাত্রাও নিশ্চিত! তাঁর তীব্র অবসাদের কি এটাই অন্যতম কারণ? উত্তর খুঁজছে পরিবার।
দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গী। একবার ভোটে হেরেই চলে গেলেন বিদ্রোহী ঋতব্রত শিবিরে! এখানেও উঠে আসছে ‘ভাইপো–তত্ত্ব’। আশিসের নিজের ছেলে বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত। দীর্ঘদিন রামপুরহাটের বাইরে। রাজনীতিতে আশিসের উত্তরাধিকার হয়ে উঠছিলেন তাঁর ভাইপো — তিনিও অভিষেক (সৌম্য) বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। রামপুরহাট থেকে তারাপীঠ যাওয়ার রাস্তায় পেল্লায় বাগানবাড়ি হাঁকিয়েছিলেন ভাইপো অভিষেক। কিন্তু তাতে বিরোধী শিবিরের নিশানায় চলে আসেন আশিসও। আশিস নিজে সরাসরি দুর্নীতিতে না জড়ালেও, কেন ভাইপোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না, ঘুরপাক খাচ্ছে সে প্রশ্নও।
কেন পারেননি? লোকে বলে, অন্ধ স্নেহ! মমতার বিরুদ্ধে যেমন অনেকেই তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি অন্ধ স্নেহের অভিযোগ তুলছেন, এ–ও নাকি তেমনই। অভিষেক (সৌম্য) বলেন, ‘ওঁর হাত ধরে আমার রাজনীতিতে আসা। সব সময়ে সৎ ভাবে মানুষের কাজ করার সুপরামর্শ দিয়েছেন। সেই ভাবে চলার চেষ্টা করেছি। তিনিই যখন রাজনীতি করতে বারণ করে গিয়েছেন, তখন আর আমরা কেউ রাজনীতি করব না।’ পরিচিতেরা অবশ্য বলেন, এই ভাইপোকেই বাঁচাতে তাঁর ঋত-শিবিরে আশ্রয়। সত্যি তা–ই কি না, জানার আর কোনও উপায় নেই।