শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়: ১৯১৫ সালের বারাণসীতে শীতের এক কনকনে রাত। ব্রিটিশ পুলিশের গোয়েন্দারা ততক্ষণে ঘিরে ফেলেছে একটা গোপন আস্তানা। চারদিকে পুলিশি পাহারা। একটু এদিক-ওদিক হলেই মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু সেই বেষ্টনী ভেদ করে বেরিয়ে এলেন একজন। তাঁর পকেটে রিভলভার, গায়ে সাধারণ কোট-প্যান্ট। চোখে মুখে নির্ভীক দীপ্তি। তাঁর নাম রাসবিহারী বসু। দেশের মাটিকে ব্রিটিশ মুক্ত করার এক অসমাপ্ত স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি চলছেন অজানা পথে।
দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলার মূল কান্ডারিকে জীবিত বা মৃত ধরার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে ব্রিটিশ পুলিশ। কিন্তু রাসবিহারী বসুকে ধরা অত সহজ নয়। পুলিশের চোখের সামনে থেকে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধরে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে উধাও হয়ে যেতেন। উত্তর ভারত থেকে ট্রেন ধরে তিনি সোজা এসে পৌঁছালেন কলকাতার খিদিরপুর বন্দরে। ইংরেজদের নাকের ডগায় তখন চলছে এক বিশাল নাটক। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি যে মোস্ট ওয়ান্টেড এই বিপ্লবী সরাসরি বিলেতি জাহাজে চেপে বসবেন।
একটি জাপানি জাহাজে চড়ে তিনি পাড়ি দিলেন সমুদ্রে। জাহাজের নাম ‘সানুকি মারু’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয় পি. এন. ঠাকুর বা প্রিয়নাথ ঠাকুর হিসেবে নিজের পরিচয় দিলেন। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। সমুদ্রের বুকে পদে পদে ওৎ পেতে রয়েছে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ। যেকোনো মুহূর্তে তল্লাশি হতে পারে। ধরা পড়লেই ফাঁসি। কিন্তু নিজের চতুর বুদ্ধির জোরে রাসবিহারী সেই বিপদও কাটিয়ে উঠলেন। সিঙ্গাপুর হয়ে অবশেষে তিনি পা রাখলেন জাপানের মাটিতে। অচেনা দেশ, ভাষাও অজানা। সহায় বলতে শুধু পকেটে থাকা কিছু অর্থ আর দেশপ্রেম।
জাপানে পৌঁছেও কিন্তু তাঁর স্বস্তি মেলেনি। ব্রিটিশ সরকার জাপানের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করল যাতে এই পলাতক ভারতীয় বিপ্লবীকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ফলে জাপানে গিয়েও রাসবিহারীকে দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছিল। কখনো ছদ্মবেশে এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়ানো, কখনো আবার বন্ধুহীন রাতে পুলিশের চোখ এড়াতে পালিয়ে বেড়ানো—এক রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়েও কম ছিল না তাঁর সেই দিনগুলো।
ঠিক এই চরম অনিশ্চয়তা আর ক্লান্তির মাঝেই তাঁর জীবনে এল এক নাটকীয় মোড়। টোকিওর এক বিখ্যাত বেকারি এবং রেস্তোরাঁর মালিক আয়ো সোমা এবং তাঁর পরিবার সাদরে আশ্রয় দিল এই ভারতীয়কে। বিপদের দিনে যারা ছায়া হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল, তাদের মন জয় করতে বেশি সময় লাগেনি রাসবিহারীর। শুধু রাজনীতি নয়, তিনি জাপানিদের মন জয় করলেন অন্য এক জাদুকরি উপায়ে। ভারতের খাঁটি মশলা আর সুগন্ধী দিয়ে তিনি রাঁধলেন এক স্পেশাল মুরগির মাংসের পদ। বাঙালি রান্নার গন্ধ আর স্বাদে নিমেষেই মন জয় করল জাপানিদের। সেই পরিবারের কর্ত্রী আয়ো সোমা এবং তাঁর গুণবতী কন্যা তোশিকো সোমার সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য গড়ে উঠল। পরবর্তীতে তোশিকো সোমাকে বিয়ে করে তিনি জাপানের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলেন। ভিনদেশে নিজের শিকড় ছড়ানোর পাশাপাশি তিনি কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও ভোলেননি পরাধীন ভারতকে। জাপানে বসেই তিনি গড়ে তুললেন ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ। পরবর্তীতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর হাতে এর দায়িত্ব তুলে দেন। নতুন নাম হয় আজাদ হিন্দ ফৌজ।
রাসবিহারী বসু, যিনি ব্রিটিশের সমস্ত চোখরাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমুদ্র পেরিয়েছিলেন। যিনি ভিনদেশের মাটিতেও বাঙালি রান্নার জাদুতে জয় করেছিলেন জাপানিদের মন। তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই করা হয়নি।