শতাব্দী রায়
২০০৯ সাল থেকে আশিসদা আমার অভিভাবকের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন, আমিও ওঁকে খুব শ্রদ্ধা করতাম। আমাদের সম্পর্কটা খুব ভালো... মানে আশিসদা খুব মজার লোক ছিলেন। এবং আমি রেগে গেলে আমাকে সামলাতেন।
প্রত্যেকবারই বলতেন, ‘জিতবে, তুমি চিন্তা কোরো না’। নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে বার বার বলতেন, ‘তুমি জিতবে, এ বারও বলেছিলেন, ১ লাখের বেশি ভোটে জিতবে। তোমার চিন্তা নেই, তুমি ভাববে না।’ আমি তাই ভাবছি যে, এই বলার লোকটাই চলে গেলেন।
উনি বলতেন, ‘আমি এত বছর পলিটিক্যাল কেরিয়ারে পলিটিক্সের বাইরে কোনও মানুষ এত সিরিয়াসলি রাজনীতিটা করেছে, সেটা তোমাকে ছাড়া কাউকে দেখিনি।’ এটা আমার জন্যে বিরাট পাওনা ছিল, এই সার্টিফিকেটটা। আশিসদার সঙ্গে প্রত্যেক সময়েই আমি সবকিছুই শেয়ার করতাম। আশিসদা এটা হয়েছে, রাগ হলে, দুঃখ হলে, অপমান হলে—সবকিছুই বলতাম। আশিসদা সোজা বোঝাতেন... মানে কিছু বলার থাকলে নিজেও আমার থেকে জিজ্ঞেস করতেন, ‘কী করা উচিত? কী করব?’
অসম্ভব একটা ভালো মানুষ এবং সৎ মানুষ। পলিটিক্সে সচরাচর এরকম মানুষ পাওয়া যায় না। এত বছরের এমএলএ, 'স্যর'—আমি বলতাম আপনি স্যর, সবার স্যর! কত ছাত্র-ছাত্রী ওঁর হাত থেকে বেরিয়েছে, কত ছাত্র-ছাত্রীকে মানুষ করেছেন...
আশিসদা কেন এটা করলেন, আমার কাছে উত্তর নেই। যে বয়সে গিয়ে এটা করলেন, একটা মানুষ কতটা অবসাদে গেলে এটা হতে পারে... জানি না। আমি এখনও মানতে পারছি না, আমার এখনও চোখে জল আসছে না, আমার এখনও মনে হচ্ছে, সত্যি নয়, মিথ্যে।
আসলে সমাজটা এমন জায়গায় চলে গিয়েছে! এই সোশ্যাল মিডিয়া, এই আশেপাশের মানুষ—যে ভাবে প্রত্যেককে অ্যাটাক করছে। সম্মানিত লোকদের মৃত্যুর পথ বেছে নেওয়া কোনও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, যে মানুষটা এতদিন ধরে সম্মান পেয়ে এসেছেন, তাঁর সমালোচনা অন্য বিষয়। কিন্তু যে ভাষায়, যে ভাবে অ্যাটাক করা হচ্ছে, সোসাইটি যে জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে, মানুষের হিংস্রতা যে জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে, মানুষ আরেকটি মানুষকে আঘাত করছে, দুঃখ দিয়ে যে স্যাটিসফ্যাকশন পাচ্ছে, যে আনন্দ উপভোগ করছে—সেটা সামনের মানুষের কত ক্ষতি করছে, সে মানুষটা কোথায় চলে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে, সে কত দুঃখে ডুবে যাচ্ছে, এটা কিন্তু কেউ ফিল করছে না।
এই যে আজকে মৃত্যুর পরেও কিন্তু মানুষে বলবে না যে হ্যাঁ মারা গিয়েছে, তাঁরা বলবেন— ‘হ্যাঁ, যেমন করেছেন, তেমন ফল হয়েছে। আচ্ছা, আপনি কী করেছিলেন জানান?’ এই যে সোসাইটির যে অধঃপতন, মানুষের প্রতি মানুষের একটুও দয়া নেই, আর সবাই জাজমেন্টাল, সবাই জাজ, সবাই নিজেকে ছাড়া সবার বিচার করছে!
TRDA-এর তো আশিসদা চেয়ারম্যান ছিলেন না। সেখানে বোধহয় কিছু... আমি জানি না তারপরে কী হয়েছে। কিন্তু আশিসদা তো এমনিতেই সৎ মানুষ। কিন্তু কোনওভাবে যেহেতু চেয়ারম্যান, সে হেতু তিনি জড়িয়ে যাবেই বা জড়িয়ে গিয়েছেন হয়তো। আমি জানি না মানে, আমি সামনে গেলে বা TRDA-এর কী অবস্থা জানতে পারব, আমি এখনও জানি না ঠিক মতো খবরটা। তবে দেখলাম, লিখেছেন যে TRDA-এর কথা। সুতরাং ওটা নিশ্চয়ই কিছু একটা লোকজন বলেছিল। মানুষের কথা ভীষণ এফেক্ট করে।
রিপোর্টিং: ঋতভাস চট্টোপাধ্যায়