শুভাশিস সৈয়দ
দেশের প্রথম মহিলা চিকিৎসক (কাদম্বিনী বসু) কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে উত্তীর্ণ হয়েছেন বছর আটেক হয়েছে। পাশ্চাত্য চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যবহার তখন শহরকেন্দ্রিক। গ্রামেগঞ্জে গাছ-গাছালি, আয়ুর্বেদই ভরসা গ্রামবাসীদের। পর্দাপ্রথার কারণে পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে দ্বিধাবোধ করেন মহিলারা। সেই সময়ে মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে চিকিৎসার আলো জ্বেলেছিলেন ডাঃ লুসি নিকলসন। প্রত্যন্ত গ্রামে পথচলা শুরু করে ‘লন্ডন মিশনারি হাসপাতাল।’ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ যেন ‘বিশল্যকরণী’ খুঁজে পেয়েছিলেন ওই এক চিলতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। দীর্ঘ অবহেলা ও প্রশাসনিক গাফিলতিতে আজ তা মৃতপ্রায়। ঐতিহাসিক সেই হাসপাতালকে সাজিয়ে তোলার দায়িত্ব নিতে চলেছে নতুন সরকার। এ বার দিন গোনার পালা।
১৮৯৪ সালের কথা। ভাগীরথী তীরবর্তী জনপদে ছড়িয়ে ছিল জঙ্গল, কাঁচা রাস্তা আর অল্প কয়েকটি বসতি। সন্ধ্যা নামলেই স্টেশন চত্বর ও রাস্তার মোড়ে কেরোসিনের বাতি জ্বালানো হতো। লোকমুখে ছিল বাঘের আতঙ্ক। প্রান্তিক মানুষগুলোর কাছে ‘নাইটিঙ্গেল’ হয়ে উঠেছিলেন ‘লুসি জয়েস’। ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর হাত ধরেই জিয়াগঞ্জে জন্ম নেয় লন্ডন মিশনারি হাসপাতাল, যা পরে সমগ্র অবিভক্ত বাংলায় ‘হকার্স হাসপাতাল’ নামে খ্যাতি অর্জন করে। হাসপাতাল তৈরির আগে ডাঃ লুসি আশ্রয় নিয়েছিলেন জিয়াগঞ্জের বিশিষ্ট জমিদার রায়বাহাদুর সুরেন্দ্রনারায়ণ সিংহ নেহালিয়ার বাড়িতে। সেখান থেকেই দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা করতেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন, একটি স্থায়ী হাসপাতাল ছাড়া মানুষের প্রকৃত সেবা সম্ভব নয়। লুসির মানবিক উদ্যোগে মুগ্ধ হয়ে নেহালিয়া পরিবার তাঁদের সম্পত্তি থেকে ৪২ বিঘা জমি দান করেন। সেই জমির একাংশে একটি আটচালা খড়ের ঘর নির্মাণ করে শুরু হয় দাতব্য চিকিৎসালয় — ‘ক্রিশ্চিয়ান সেবা সদন’। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই ছোট্ট চিকিৎসাকেন্দ্র পরিণত হয় পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে। রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় ১৮৯৮ সালে ইংল্যান্ড থেকে জিয়াগঞ্জে আসেন আর এক তরুণী চিকিৎসক ডাঃ অ্যালিস হকার। দরিদ্রদের প্রতি তাঁর সীমাহীন মমতা, নিরলস পরিশ্রম এবং অসাধারণ মানবিকতার জন্য সাধারণ মানুষ হাসপাতালটিকেই তাঁর নামে ডাকতে শুরু করেন — ‘হকার্স হাসপাতাল’।
সম্প্রতি প্রকাশিত ‘Journal of Historical Studies and Research’-এ বহরমপুর গার্লস কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গণেশকুমার মণ্ডলের গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে সেই বিস্মৃত অধ্যায়ের নানা তথ্য। গবেষণাপত্রে উল্লেখ রয়েছে, চিকিৎসার জন্য কখনও ঘোড়ার গাড়িতে, কখনও হেঁটে দূরদূরান্তে যেতেন ডাঃ লুসি ও ডাঃ হকার। একবার বালুচরের পথে ঘোড়ার গাড়িতে যাওয়ার সময়ে তাঁদের সামনে বাঘ চলে আসে। চালকের উপস্থিত বুদ্ধি ও অস্ত্র থাকায় তাঁরা রক্ষা পান। এ থেকে সহজেই যা অনুমেয়, তা হলো, সেই সময়ে প্রান্তিক এলাকায় চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশ ছিল ভীষণই প্রতিকূল। প্রথমদিকে হাসপাতালটি শুধুমাত্র নারী ও শিশুদের জন্য ছিল। ১৯১০ সালের পর ধাপে ধাপে চালু হয় বিভিন্ন ওয়ার্ড। ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিখ্যাত ‘ইসাবেল মেলোর ওয়ার্ড’, যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বাংলার তৎকালীন গভর্নর আর্ল অব লিটন।
শুধু জিয়াগঞ্জ নয়, ধীরে ধীরে বিস্তীর্ণ জনপদের অন্যতম ভরসা হয়ে ওঠে এই হাসপাতাল। ক্রমে মানুষের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিকতার স্পর্শ পায় হাসপাতাল। তৈরি হয় অপারেশন কক্ষ। আজকের আধুনিক এলইডি অপারেশন থিয়েটারের বহু আগে জিয়াগঞ্জের এই হাসপাতালে নির্মিত হয়েছিল এক অভিনব অপারেশন কক্ষ। উত্তর ও পূর্বমুখী বিশাল কাচের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো সরাসরি অপারেশন টেবিলে পড়ত। রাতে ব্যবহার করা হতো জার্মানি থেকে আমদানি করা শক্তিশালী বৈদ্যুতিক আলো। সেই সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এই নকশা ছিল অত্যন্ত আধুনিক। মালদা, দিনাজপুর, নদিয়া, বীরভূম, বর্ধমান, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ — অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ চিকিৎসার জন্য জিয়াগঞ্জে আসতেন। হাসপাতালের বহির্বিভাগে এত ভিড় হতো যে, ১৯৫৬ সাল থেকে টিকিট ব্যবস্থা চালু করতে হয়। সংগৃহীত অর্থ দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় করা হতো।
জিয়াগঞ্জের হকার্স হাসপাতালের ইতিহাস কেবল একটি চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়। এটি মুর্শিদাবাদের আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা, নার্সিং শিক্ষা, মাতৃসেবা এবং সমাজসেবার বিকাশের ইতিহাস। গবেষণা অনুযায়ী, সত্তরের দশকে একে একে বিদেশি মিশনারি চিকিৎসকেরা চলে যাওয়ার পরে হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে। নার্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও পরে স্থানান্তরিত হয়। হাসপাতালের আয় কমে যায় এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হতে শুরু করে। সরকারি নথি অনুযায়ী, জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পুরসভার ২০০৮ সালের এক সরকারি পত্রে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘ আর্থিক সঙ্কট এবং প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণে হাসপাতালটি এক দশকেরও বেশি সময় কার্যত অচল ছিল। নথিতে আরও বলা হয়েছে, মিশনারি আমলের বহু যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল অথবা অকেজো হয়ে পড়েছিল। সরকার যখন প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন সেটি ‘প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায়’ ছিল। সরকার হাসপাতালটি মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদের হাতে তুলে দিলে মূল ভবনের কিছু সংস্কার করে বহির্বিভাগ চালু করা হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থ, চিকিৎসক ও অবকাঠামোর অভাবে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালানো সম্ভব হয়নি। ২০০০ সালের বন্যার পরে সেই পরিষেবাও বন্ধ হয়ে যায় এবং পরে জেলা পরিষদ হাসপাতালের দায়িত্ব ফেরত দেয়। পরে ২০০৫-০৬ সালে জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পুরসভা হাসপাতালটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু পরিচালনা পর্ষদের আলোচনায় স্বীকার করা হয়, শতাধিক শয্যার একটি হাসপাতাল চালাতে বিপুল অর্থ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। পুরসভার একার পক্ষে তা বহন করা সম্ভব নয়। তাই রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তা চাওয়া হয়।
১) দীর্ঘদিন হাসপাতাল বন্ধ থাকায় পরিকাঠামো ভেঙে পড়ে।
২) আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অপারেশন থিয়েটার অচল হয়ে যায়।
৩) পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ানের অভাব ছিল।
৪) নিয়মিত আর্থিক সহায়তার ঘাটতি ছিল।
৫) ঐতিহ্যবাহী ভবন সংরক্ষণ এবং আধুনিকীকরণ—দু’টিই একসঙ্গে করা সম্ভব হয়নি।
নতুন সরকার এই হাসপাতালকে ব্যবহারযোগ্য করার অঙ্গীকার করেছেন। রাজ্যের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষের কথায়, ‘ভোটের আগে আমরা মানুষকে কথা দিয়েছিলাম যে, লন্ডন মিশন হাসপাতাল আবার চালু করা হবে। স্বাস্থ্য দপ্তর ও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’ এক বছরের মধ্যে হাসপাতাল চালুর কথা বলা হলেও কাজ তার আগেই শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
জিয়াগঞ্জের হাসপাতালটির গুরুত্ব শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের ভরসা হতে পারে এই হাসপাতাল।
১) হাসপাতালটি জিয়াগঞ্জ শহরের অদূরে ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। পশ্চিমে নদীর ও পারে আজিমগঞ্জ। জিয়াগঞ্জের সঙ্গে লালবাগ, বহরমপুর, লালগোলা ও ভগবানগোলার সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। ফলে হাসপাতালটি ফের সক্রিয় হলে জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জের পাশাপাশি আশপাশের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকার মানুষের চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প তৈরি হতে পারে।
২) জিয়াগঞ্জ-মুর্শিদাবাদ ব্লক, লালবাগ মহকুমার সংলগ্ন এলাকা, ভগবানগোলা, লালগোলা এবং বহরমপুরমুখী ভাগীরথীর দুই পাড়ের জনপদ থেকে রোগীদের একটি অংশ এখানে আসতে পারবেন। জিয়াগঞ্জ-মুর্শিদাবাদ ব্লকের উত্তরে ভগবানগোলা-১ ও ২, পূর্বে রানিনগর-১, দক্ষিণে বহরমপুর এবং পশ্চিমে নবগ্রাম ব্লক — এই ভৌগোলিক অবস্থান হাসপাতালটির সম্ভাব্য পরিষেবা-পরিধি যে যথেষ্ট বড়, তা বোঝায়।
৩) নদী ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াগঞ্জ ও আজিমগঞ্জ ভাগীরথীর দুই দিকে অবস্থিত। ফলে হাসপাতালটি আধুনিক পরিকাঠামোয় সেজে উঠে ফের চালু হলে ভাগীরথীর দুই পাড়ের মানুষের চিকিৎসা-প্রবেশাধিকার বাড়তে পারে।
৪) হাসপাতালটি জিয়াগঞ্জ শহরের সামান্য উত্তরে এবং জিয়াগঞ্জ রেলস্টেশনের কাছাকাছি হওয়ায় দূরের রোগীদের কাছেও তা তুলনামূলক ভাবে সহজলভ্য।
৫) হাসপাতালটি চালু হলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জের বাইরে থাকা রোগীদের চিকিৎসার যাতায়াতে। এখন বহু ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের বহরমপুরের দিকে যেতে হয়। জিয়াগঞ্জে একটি কার্যকর হাসপাতাল গড়ে উঠলে উত্তর ও মধ্য মুর্শিদাবাদের একাংশের রোগীদের উপর বহরমপুরের বড় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলির চাপও কিছুটা কমতে পারে।
এখন প্রশ্ন, প্রতিশ্রুতির সময়সীমা নয় — কবে থেকে ফের চিকিৎসার দরজা খুলবে প্রাচীন লন্ডন মিশন হাসপাতালে? জিয়াগঞ্জের ১৩২ বছরের পুরোনো চিকিৎসা-ঐতিহ্য কি এবার সত্যিই নতুন অধ্যায় শুরু করবে?
১. জিয়াগঞ্জের হকার্স হাসপাতাল কী?
জিয়াগঞ্জের হকার্স হাসপাতাল আসলে ঐতিহাসিক লন্ডন মিশন হাসপাতাল। ১৮৯৪ সালে ডাঃ লুসি নিকলসনের উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরে ডাঃ অ্যালিস হকারের অবদানের কারণে ‘হকার্স হাসপাতাল’ নামে পরিচিতি পায়।
২. হকার্স হাসপাতাল কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮৯৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জিয়াগঞ্জে লন্ডন মিশন হাসপাতালের পথচলা শুরু হয়।
৩. কেন হকার্স হাসপাতাল দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল?
দীর্ঘদিনের আর্থিক সঙ্কট, প্রশাসনিক অস্থিরতা, পরিকাঠামোর অবনতি এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও প্রযুক্তিবিদের অভাবে হাসপাতালের পরিষেবা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
৪. হকার্স হাসপাতাল ফের চালু হলে কারা উপকৃত হবেন?
জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জের পাশাপাশি লালবাগ, ভগবানগোলা, লালগোলা, বহরমপুর সংলগ্ন এলাকার বহু মানুষ এই হাসপাতালের পরিষেবা পেতে পারেন।
৫. কবে ফের চালু হতে পারে জিয়াগঞ্জের হকার্স হাসপাতাল?
রাজ্যের মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, এক বছরের মধ্যে হাসপাতালটি চালুর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট উদ্বোধনের তারিখ এখনও ঘোষণা করা হয়নি।