স্বাধীনতার ৮০ বছরে ন্যায়, সাম্য ও সংবিধানের আদর্শে এগিয়ে চলার আহ্বান জানালেন হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী
দৈনিক স্টেটসম্যান | ১৫ আগস্ট ২০২৬
৮০ তম স্বাধীনতা দিবস আমাদের কাছে শুধুমাত্র একটি জাতীয় উৎসব নয়, আত্মত্যাগ, সংগ্রাম এবং অসংখ্য মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাসকে স্মরণ করার এক পবিত্র মুহূর্ত। এই ঐতিহাসিক দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সেই সমস্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীকে, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ভারত আজ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতীয় নারীদের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাঁরা শুধু ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকেননি, সরাসরি সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। বীণা দাসের সাহস, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মবলিদান, মাতঙ্গিনী হাজরার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত জাতীয় পতাকা উঁচিয়ে রাখার অদম্য প্রত্যয়, সরোজিনী নাইডুর নেতৃত্ব, কল্পনা দত্ত ও কল্যাণী দাসের মতো বিপ্লবীদের সংগ্রাম আমাদের ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়।
তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়,স্বাধীনতা কখনও বিনামূল্যে অর্জিত হয় না। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রাম এবং অসংখ্য অজ্ঞাতনামা বিপ্লবীর আত্মত্যাগও আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের সাহস, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম আজও আমাদের পথ দেখায়।
স্বাধীনতার ৮০ বছরে ভারত বহু দূর এগিয়েছে। প্রযুক্তি, ডিজিটাল পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশের অগ্রগতি বিশ্বমঞ্চে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। UPI-এর মতো ডিজিটাল উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার সুফল সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
একইভাবে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে নয়; তার বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যেও নিহিত। ন্যায়বিচার সংবিধানের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেয়। বিচারহীন স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ, আর ন্যায়বিচারই নাগরিকের স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলে।
গত এক বছরে কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court) এবং পশ্চিমবঙ্গ ও আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বিচারব্যবস্থা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষায়িত আদালত, লিগ্যাল সার্ভিসের প্রসার এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিচারপ্রাপ্তির সুযোগ আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা চলছে।
ভাষার বাধা দূর করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘সুভাষ’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন হাই কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায় বাংলায় অনুবাদের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কাছে আইন ও বিচারব্যবস্থাকে আরও সহজবোধ্য করে তুলছে। কারণ, ন্যায়বিচার তখনই প্রকৃত অর্থে মানুষের হয়, যখন মানুষ নিজের ভাষায় নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারেন।
পাবলিক পরীক্ষার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক কার্যকারিতা, বিশেষ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মতো ক্ষেত্রেও বিচারব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উদ্যোগের মূল লক্ষ্য একটাই,সংবিধানের ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করা।
আজকের দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর প্রার্থনা আমাদের নতুন করে পথ দেখায়—’চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। যে দেশে জ্ঞান মুক্ত, যেখানে মানুষ ভয়হীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, যেখানে যুক্তির স্বচ্ছ স্রোত মৃত অভ্যাসের মরুভূমিকে অতিক্রম করে—সেই ভারত গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
স্বাধীনতার ৮০ বছরে আমাদের অঙ্গীকার হোক—ন্যায়, সাম্য, স্বাধীনতা ও মানবিকতার মূল্যবোধকে আরও শক্তিশালী করা। বিচারব্যবস্থা হবে মানুষের আস্থার জায়গা, সংবিধান হবে আমাদের পথপ্রদর্শক এবং নাগরিকের অধিকার রক্ষা হবে আমাদের সর্বোচ্চ দায়িত্ব। যাঁরা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি এটাই হবে আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি—একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমতাভিত্তিক এবং মানবিক ভারত গড়ে তোলা।
স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে উপস্থিত ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টে (Calcutta High Court) ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী (Acting Junstice Tapobrata Chakraborty) , বিচারপতি সৌগর ভট্টাচার্য, বিচারপতি দেবাংশু বসাক বিচারপতি অমৃতা সিনহা বিচারপতি রাজা বাসু চৌধুরী বিচারপতি অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় বিচারপতির তীর্থঙ্কর ঘোষ বিচারপতি শম্পা সরকার। কলকাতা হাইকোর্টের বার এসোসিয়েশনের সভাপতি (Calcutta High Court) সংকর প্রসাদ দলপতি বিশিষ্ট আইনজীবী জয়ন্ত মিত্র, বিশিষ্ট আইনজীবী অনিন্দ্য মিত্র সহ হাইকোর্টের প্রশাসনিক একাধিক আধিকারিক (Calcutta High Court)।