প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া
তিন জনের সংসার। স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান। কিন্তু বাবা-ছেলের হাঁটাচলার ক্ষমতা নেই! বাবা চক্রধর মাহাতো কোনও মতে ট্রাইসাইকেলের হাতলে জোর পান,১০ বছরে পা দেওয়া ছেলে সায়নের শরীরও অসাড় হতে শুরু করেছে। পুরুলিয়ার হুড়া ব্লকের পখুরিয়া গ্রামের এই সংসারে ভরসা বলতে ছিল মানবিক (প্রতিবন্ধী) ভাতা ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সাড়ে তিন হাজার টাকা এবং সরকারি রেশনের চাল-গম। কিন্তু রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে এক লহমায় বদলেছে ওদের জীবন।
বন্ধ হয়েছে সামাজিক প্রকল্পের সব আর্থিক সাহায্য। চলতি মাসে যন্ত্রের এক অমোঘ নির্দেশে পুরোপুরি বন্ধ রেশন। বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ হারিয়ে আজ আক্ষরিক অর্থে অনাহারের মুখোমুখি চক্রধর ও তাঁর পরিবার।
ছোটবেলা থেকেই দুই পায়ে গভীর সমস্যা বছর ৪৯-এর চক্রধরের। তবু মনের জোর আর পড়াশোনার অদম্য জেদ কম ছিল না। ইতিহাসে মাস্টার্স করার পরে ডিএলএড প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। বুনেছিলেন স্বপ্ন— অন্তত একটা প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকতা জুটে গেলে সংসার উতরে যাবে। কিন্তু দিন গড়িয়েছে, চাকরি মেলেনি। অভাবের সংসারে উপযুক্ত চিকিৎসাও অধরা থেকেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে ক্রমে অসাড় হয়ে পড়েছে দুটো পা।
সেই যন্ত্রণা আরও বাড়ে যখন দেখেন, ছেলে সায়নের শরীরও হুবহু তাঁরই মতো অসাড় হতে শুরু করেছে। সায়ন এখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। তাকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া আর ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন স্কুলের সহৃদয় শিক্ষক মন্টু মাহাতো। প্রতিদিন মাস্টারমশাইয়ের মোটরবাইকে চেপে স্কুলে যাতায়াত করে সায়ন।
মানবিক ভাতার জন্য স্বাস্থ্য দপ্তরের ‘পরীক্ষায়’ উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৬ থেকে ১০০০ টাকার সরকারি সহায়তা পেতেন চক্রধর। ২০২৪ থেকে ছেলেও সেই ভাতা পেতে শুরু করে। স্ত্রী ছন্দারানি মাহাতোর লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বাবদ মিলত আরও ১৫০০ টাকা। সবমিলিয়ে ৩৫০০ টাকা আর রেশন থেকে পাওয়া চাল-গম দিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইটা চলছিল। এখন সব বন্ধ!
চক্রধরের আক্ষেপ, অন্নপূর্ণা যোজনায় অফলাইন-অনলাইন, দু’ভাবে আর্জি জানিয়েও কাজ হয়নি। রান্নাঘরে তবু হাঁড়ি চড়ছিল রেশনের জোরে। কিন্তু চলতি মাসে রেশন দোকানে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁদের ডিজিটাল পিএইচএইচ (প্রায়োরিটি হাউসহোল্ড) রেশন কার্ড স্রেফ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যন্ত্র জানিয়ে দিয়েছে, ওই কার্ডে আর খাদ্যসামগ্রী মিলবে না। ব্লক খাদ্য পরিদর্শকের কাছে দৌড়াদৌড়ি করেও লাভ হয়নি, বলা হয়েছে—‘সিস্টেম’ থেকেই নাকি এই কার্ড বাতিল হয়ে গিয়েছে।
ঘরে এখন অন্ন সংস্থান নেই। আধপেটা খেয়ে দিন কাটছে পরিবারের। অগত্যা শুক্রবার সকালে জং ধরা ট্রাইসাইকেল টেনে বিডিও অফিসে পৌঁছন চক্রধর। সারা দিন পেটে খিদে নিয়ে অফিসের বাইরে অপেক্ষা করেছেন বিডিও-র জন্য। চক্রধর জানালেন, একা হাতে ট্রাইসাইকেল টেনে তিনি এসেছেন, কারণ স্ত্রী দিনমজুরের কাজে না-গেলে ঘরে রাতে মুড়ি-জলটুকুও জুটবে না। এখন রোয়া দেওয়ার মরশুমে শ’দুয়েক টাকা পাওয়ার আশায় স্ত্রী অন্যের জমিতে কাজে নেমেছেন। আর ছেলে অন্তত দুপুরে স্কুলে মিড-ডে মিলের পেট ভরা খাবারটুকু পাবে বলে তাকে স্কুলে রেখে এসেছেন। চক্রধরের একটাই প্রশ্ন— ‘এ বার আমরা কী খেয়ে বাঁচব?’
ব্লক প্রশাসনের অন্দরে পৌঁছেছে অভিযোগ। হুড়ার বিডিও শিলাদিত্য জানা জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে খাদ্য পরিদর্শককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও ব্লক খাদ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রশাসনিক খাতায় চক্রধরের নামে প্রায় পাঁচ একর জমির উল্লেখ থাকায় ‘সিস্টেম’ নিজে থেকেই নাকি এই কার্ড বাতিল করে দিয়েছে। তা শুনে চোখে জল চক্রধরের। তাঁর বক্তব্য, গ্রামে তাঁদের মাত্র তিন বিঘা কৃষি জমি আছে, যা সম্পূর্ণ বৃষ্টি নির্ভর। বৃষ্টি হলে সামান্য কিছু ফসল ওঠে, না–হলে জমি বন্ধ্যা। বাকি জমি ডাঙা আর অনাবাদি।
চক্রধর বললেন ‘যার দু’পায়ে হাঁটার শক্তি নেই, সে চাষ করবে কী ভাবে! বাম থেকে তৃণমূল— কোনও আমলেই একটা চাকরি মেলেনি, আর আজ মুখের গ্রাসও কেড়ে নেওয়া হলো।’ বিষয়টি শুনে রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ ও পূর্ত বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তথা পাড়া কেন্দ্রের বিধায়ক নদিয়ারচাঁদ বাউড়ি জানান, দ্রুত ওই পরিবারের খোঁজ নেবেন। তবে অন্নপূর্ণা যোজনা বা মানবিক ভাতার মতো সরকারি সাহায্যগুলি কেন এই পরিবারের জন্য বন্ধ হলো, সে বিষয়ে প্রশাসনিক আধিকারিকদের প্রতিক্রিয়া মেলেনি।