গান্ধীর সঙ্গে হাজতবাস, ১০০ বছর বয়সেও বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দিয়েছেন কলকাতার বিপ্লবী শরফুদ্দিন
প্রতিদিন | ১৩ আগস্ট ২০২৬
ভারতের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের (Independence Day) দীর্ঘ অধ্যায়ের অঙ্গ চিকিৎসকরাও, যাঁরা নিঃস্বার্থ জনসেবায় নিয়োজিত ছিলেন সেই সময়। এমনই এক ব্যক্তি হাকিম সৈয়দ মোহাম্মদ শরফুদ্দিন কাদরি। স্বাধীনতা-পরবর্তী বছরগুলোয় তাঁর অনন্য অবদানের কথা মানুষ প্রায় ভুলতেই বসেছে বর্তমানে। বিভিন্ন সূত্র মতে, ১৯০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিহারের নওয়াদা জেলার কুমরাওয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা মোহাম্মদ মোহিব্বুদ্দিন ছিলেন ‘ইউনানি’ চিকিৎসক। বাবার কাছ থেকেই তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে নিজেও ইউনানি চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
তবে তাঁর পরিচয় কেবল চিকিৎসক হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৩০ সালের লবণ সত্যাগ্রহ ও ডান্ডি অভিযানে তিনি মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে যোগ দেন। অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে কারাবরণেও নিয়ে যায়। বিভিন্ন সমকালীন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, কটকের কারাগারে তিনি গান্ধীর সঙ্গে একই সময়ে বন্দি ছিলেন।
তবে স্বাধীনতার পরে ক্ষমতার রাজনীতিতে যাওয়ার পরিবর্তে তিনি বেছে নিয়েছিলেন মানুষের সেবা। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। এখানে এসে তিনি হাজি মোহাম্মদ মহসিন স্কোয়ারে ‘স্বদেশী দাওয়াখানা’ প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থের বিনিময়ে নয়, মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে চিকিৎসা করতেন তিনি। চিকিৎসার বিনিময়ে একটি টাকাও তিনি নিতেন না মানুষের কাছ থেকে।
সমসাময়িক প্রতিবেদন জানায়, ১০৫ বছর বয়সেও তিনি প্রতিদিন প্রায় ১০০ জন রোগীর বিনামূল্যে চিকিৎসা করতেন। ইউনানি চিকিৎসা ছিল তাঁর গভীর অনুরাগের বিষয়; নাড়ি দেখেই রোগ নির্ণয় করতে পারতেন। কথিত রয়েছে, ভারতের প্রথম প্রেসিডেন্ট ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের অসুস্থতার সময়েও চিকিৎসার ভার পড়েছিল তাঁর উপরেই।
চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি কলকাতায় শিশুদের জন্য স্কুল এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সাক্ষরতা আন্দোলনেও ভূমিকা রাখেন। তিনি ‘হিকমত-এ-বাঙ্গালা’ (Hikmat-e-Bangala) নামে একটি চিকিৎসাবিষয়ক পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন। ‘ক্যালকাটা ইউনানি মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।
এছাড়াও, দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা করেছিলেন হাকিম সৈয়দ মোহাম্মদ শরফুদ্দিন কাদরি। তাঁর কাছে ভারত ছিল এক অভিন্ন মাতৃভূমি, যা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা যায় না। দীর্ঘ কয়েক দশকের সেবার স্বীকৃতি আসে ২০০৭ সালে। রাষ্ট্রপতি ড. এ.পি.জে. আবদুল কালাম রাষ্ট্রপতি ভবনে পদ্মভূষণ পুরস্কার প্রদান করেন, ১০৬ বছর বয়সী হাকিম শরফুদ্দিন কাদরি গ্রহণ করেন তা।
পদ্মভূষণ পাওয়ার পরেও মানুষের কাছে তিনি নিজেকে শুধুই একজন হাকিম বলে পরিচয় দিতেন। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ সালে কলকাতার রিপন স্ট্রিটের বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর মাত্র তিন দিন আগে তাঁর ১১৪তম জন্মদিন পালন করা হয়েছিল, যদিও জন্মতারিখ ও বয়স নিয়ে কিছু ঐতিহাসিক অনিশ্চয়তা থেকে যায়।