• যিনি পারছেন একবার করে রং করে আসছেন, কী চলছে অ্যাকাডেমি ঘিরে?
    আজ তক | ১৩ আগস্ট ২০২৬
  • কলকাতার রবীন্দ্র সদনের অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। একমাসে তিনবার রং বদল ঘটল অ্যাকাডেমির। প্রসঙ্গত, গত মঙ্গলবার পুরনো রঙে ফিরেছিল অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ফের রং বদল ঘটেছে। শিবপুরের বিধায়ক তথা অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষের উপস্থিতিই বুধবার বিকালে ফের গেরুয়া রঙের প্রলেপ পড়েছে অ্যাকাডেমির একাংশে।

    ঘটনার সূত্রপাত গত  জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে। অ্যাকাডেমির মূল গেটের পাশে থাকা  টিকিট কাউন্টারের ঘরটিতে আচমকাই গেরুয়া রং করে দেওয়া হয়। বিষয়টি সামনে আসতেই প্রতিবাদে সরব হন নাট্যকর্মী ও শিল্পীদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এই প্রতিষ্ঠানের পরিসরে হঠাৎ গেরুয়া রং করার সিদ্ধান্ত নিয়ে । কেন এই রং করা হল, তা নিয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন তাঁরা।এরপর বিষয়টি নিয়ে লিখিত অভিযোগও জানানো হয়। গেরুয়া রং সরিয়ে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলেন নাট্যকর্মীরা। কিন্তু অভিযোগ জানানোর পরও দীর্ঘ সময় কেটে যায়। তাঁদের দাবি, প্রশাসনের তরফে রং সরানোর বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের পদক্ষেপের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই মাঠে নামেন শিল্পী ও নাট্যকর্মীরা। মঙ্গলবার ওই ঘরের গেরুয়া রং মুছে তার উপর সাদা রং করে দেন তাঁরা।

     নাট্যকর্মীদের বক্তব্য, তাঁদের প্রতিবাদ কোনও নির্দিষ্ট রঙের বিরুদ্ধে নয়। বরং অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চরিত্র ও পরিবেশ বজায় রাখার দাবিতেই এই উদ্যোগ। তাঁদের মতে, এই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে নাটক, চিত্রকলা, প্রদর্শনী এবং নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই তার পরিসরে এমন কোনও পরিবর্তন, যা প্রতিষ্ঠানের চরিত্র বদলের ইঙ্গিত দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। প্রশাসনের তরফে দীর্ঘদিন কোনও পদক্ষেপ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত শিল্পীরাই হাতে তুলে নেন রং-তুলি। এদিকে বুধবার বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষরা অ্যাকাডেমি পৌঁছন। ফের সেই সাদা রং মুছে গেরুয়া করে দেওয়া হয়।

    সাংবাদিকদের সামনে অ্যাকাডেমির পুরনো ছবি তুলে ধরেন বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ। তারপর বলেন, 'কী রং ছিল? অ্যাকাডেমির টিকিট কাউন্টার গেরুয়া ছিল। মিথ্য়াচার করে করে এরা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি থেকে কোণঠাসা হয়ে গেছে। এরা সনাতন ধর্মের বিরোধিতা করে দিকভ্রান্ত হয়ে গেছে। যাঁরা ট্রাস্টি বোর্ডের লোকজনও বিরক্ত। বিকাশবাবুদের বলছি..আপনি নাট্যকর্মী সেজেছিলেন। আর যাঁরা এই রং করেছিলেন তাঁরা সিপিএম-এর হয়ে প্রচার করেন। এই ধরনের ধৃষ্টতা আসে কী করে?' রুদ্রনীল  আরও বলেন, 'এটা বিচ্ছিন্ন মানসিকতা। বিজেপির রাজ্য সভাপতির কাছে এরা ইতিহাস লুকিয়েছে। বিভিন্ন বার্তা পাঠিয়েছে। যখন দেখেছে কৃতকার্য হয়নি, তখন এই করেছে। আমরা অ্যাকাডেমির মধ্যে কোনও রাজনীতিকরণ চাই না…চাই না…চাই না..।'

    উল্লেখ্য, ১৯৩৩ সালে লেডি রানু মুখোপাধ্যায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’ বাংলার শিল্প-ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। রবীন্দ্র সদন চত্বরের সংলগ্ন এই প্রতিষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায়, নন্দলাল বসু ও রামকিঙ্কর বেইজের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের অমূল্য সব শিল্পকর্মের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। নাট্য ও শিল্প জগতের অনেকের কাছেই অ্যাকাডেমির বাইরের অংশের এই রাজনৈতিক রূপদান একটি নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক পরিসরে অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে। প্রতিবাদী শিল্পীরা রাজ্যের নেতৃত্বের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের ক্ষোভ জানিয়েছেন এবং রং পরিবর্তনের এই বিষয়টিকে স্থানীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিকৃতি হিসেবে অভিহিত করেছেন।

    এদিকে স্থানীয় দলীয় কর্মীরা অনমনীয় মনোভাব বজায় রাখলেও, বিজেপি-র রাজ্য নেতৃত্ব অনুমোদনহীন এই ‘সৌন্দর্যায়ন’ বা রং-কেন্দ্রিক প্রচার কর্মসূচি থেকে সংগঠনকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে। দলের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ‘রঙের রাজনীতি’ বা এ ধরনের কর্মকাণ্ড দলের আনুষ্ঠানিক নীতিমালার পরিপন্থী, পাশাপাশি, যথাযথ অভ্যন্তরীণ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে তাঁরা এই অননুমোদিত রং করার কাজের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।  রাজ্যে পালাবদলের পর জুলাই মাসে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের রং বদলের তীব্র নিন্দা করেছিলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। যদিও বিতর্কের পরেও প্রশাসনের তরফে রং পরিবর্তনের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। 
  • Link to this news (আজ তক)