অনির্বাণ ঘোষ
ভিন রাজ্যে রক্ত ও রক্ত উপাদান সরবরাহ নতুন নয়। যাকে বলে বাল্ক ট্রান্সফার। কিন্তু সেটাকে ঠিক 'পাচার' শব্দবন্ধে ফেলা যায় না। পাচার বা রক্তের ভয়াবহ কালোবাজারির সূত্রপাত করোনাকালে। অতিমারী পর্বে প্লাজ়মার মাধ্যমে হওয়া ইমিউনোথেরাপির ব্যাপক চাহিদাই বাংলার বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের একাংশকে অল্প সময়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দিয়েছে সীমাহীন মুনাফায়। সে মুনাফা এমনই যে মাত্র সাত বছরে রাজ্যের বিভন্ন প্রান্তে পাঁচটি ব্লাড সেন্টার খোলার নজিরও রয়েছে একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের।
বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশে স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরের চল তেমন নেই। অথচ চাহিদা আছেই। কোভিড কালে চাহিদা-জোগানের মধ্যে যে বিপুল শূন্যস্থান তৈরি হয়েছিল প্লাজ়মা থেরাপির বাজারে, অযৌক্তিক চড়া দামের বিনিময়ে তা পূরণ করতে গিয়েই ভিন রাজ্যে রক্ত পাচারে 'রক্তের স্বাদ' পেয়ে যায় এ রাজ্যের কিছু বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক। স্ক্যানারে থাকা ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির কাজকর্ম খতিয়ে দেখতে গিয়ে এমন সব তথ্যই উঠে এসেছে স্বাস্থ্য দপ্তরের অধীন স্টেট ব্লাড ট্রান্সফিউশন কাউন্সিল (এসবিটিসি)-এর তদন্তকারীদের হাতে। এবং তাঁদের উপলব্ধি, এই বিপুল মুনাফার স্বাদ পেয়ে যাওয়ার জেরেই পরবর্তীকালে কোনও নিয়ম, নীতির তোয়াক্কা না করার প্রবণতা তৈরি হয় তাদের একাংশের মধ্যে।
এক তদন্তকারী আধিকারিকের কথায়, 'শুনলে চমকে যাবেন! কলকাতারই একটি পুরোনো ব্লাড ব্যাঙ্কের রক্ত কালেকশন ও ডেসপ্যাচের মধ্যে কোনও সঙ্গতি না পেয়ে ওদের সব নথি খতিয়ে দেখতে শুরু করি। বুঝতে পারি, এক ইউনিট প্লাজ়মাকে স্রেফ স্যালাইন ওয়াটার মিশিয়ে দুই বা কখনও বা তিন ইউনিট প্লাজ়মা বানিয়ে দিয়ে বিহার-ঝাড়খণ্ডে পাচার করে দিচ্ছে তারা বিপুল টাকায়।' তিনি জানান, ১ হাজার ৫৫০ টাকার আরবিসি (লোহিত রক্তকণিকা) কমপক্ষে তিন হাজার টাকায় পাচার হয় বিহার-ঝাড়খণ্ড-মধ্যপ্রদেশে। আবার ৫০০ টাকা প্রতি ইউনিট প্লাজ়মা ভিন রাজ্যে দেড়-দু' হাজার টাকায়, এমনকী করোনাকালে আট থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রির নজিরও আছে দেদার।
সম্প্রতি স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, শুধুমাত্র প্লাজ়মা থেকে মুনাফা করার লোভে একাধিক বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক রক্তদান শিবিরে রক্তদাতার শরীর থেকে ৩৫০ মিলিলিটারের বদলে ৪৫০ মিলিলিটার রক্তও সংগ্রহ করে নেয়। এবং খোদ রক্তদাতা সে কথা জানতেই পারেন না, বা জানলেও তার তাৎপর্য বুঝতে পারেন না।
একান্তে একাধিক বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্মীরাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানাচ্ছেন, এমন অতিরিক্ত রক্ত টেনে নেওয়া হামেশাই করা হয়ে থাকে। তার জন্য বেশি দামি, বড় কালেকশন ব্যাগ লাগে। তবে দেখে নেওয়া হয়, দাতা সুস্থ আছেন কি না এবং তাঁর ওজন ৬০ কেজির বেশি কি না। স্বাস্থ্য দপ্তরের তদন্তকারীরাও আঁচ পেয়েছেন, ওই অতিরিক্ত রক্তের সৌজন্যে এক ইউনিট সংগৃহীত রক্ত থেকে প্লাজ়মা বেশি পরিমাণে মেলে বলে, তাতে স্যালাইন ওয়াটার মিশিয়ে সেটা দিয়ে দুই-তিন ইউনিট প্লাজ়মাও বানিয়ে ফেলা যায়। যাকে নিছক অনিয়ম নয়, একেবারে অপরাধ বলে আখ্যা দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্তাদের একটা বড় অংশই।
কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে, স্বাস্থ্য দপ্তরের স্ক্যানারের বাইরে থাকা একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের এক কর্তা বলেন, 'এ রাজ্যে এবং ভিন রাজ্যে বহু বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক আছে, যারা রোগীকে নয়, অ্যালবুমিন, ইমিউনোগ্লোবিউলিন, ফ্যাক্টর এইট ইত্যাদি ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুতকারক বহুজাতিক ওষুধ সংস্থাদের সরাসরি প্লাজ়মা বিক্রি করে দেয়। কারণ তখন আর রোগীক ৩৫০ মিলিলিটারের প্লাজ়মা ৫০০ বা ৭০০ টাকায় বিক্রির বদলে ওষুধ কোম্পানিকে লিটার প্রতি প্লাজ়মা অন্তত ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির সুযোগ থাকে আইনি ভাবেই।'
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্লাড ব্যাঙ্ক আধিকারিক জানান, যেহেতু ১০০ লিটার প্লাজ়মা থেকে ৭-৮ মিলিগ্রাম অ্যালবুমিন তৈরি করা যায় এবং প্রতি মিলিগ্রাম অ্যালবুমিনের দাম প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা, তাই প্লাজ়মার বাণিজ্যিক চাহিদা আকাশছোঁয়া। স্বাস্থ্য দপ্তরের একটি সূত্রের দাবি, সে জন্যই তদন্তে নামার পরে দেখা গিয়েছে, রক্ত কিংবা আরবিসি-র মতো রক্ত উপাদান পাচারের চেয়েও বেশি কালোবাজারি হচ্ছে প্লাজ়মার মতো রক্ত উপাদান নিয়ে। স্টেট ব্লাড ট্রান্সফিউশন কাউন্সিলের এক আধিকারিকের কথায়, 'যদি ১০০ ইউনিট রক্ত উপাদান ভিন রাজ্যে নিয়ম লঙ্ঘন করে পাচার করা হয়, তা হলে দেখা যায়, এর মধ্যে ৮০ ইউনিটই প্লাজ়মা, মাত্র ২০ ইউনিট আরবিসি।'