বিধানসভায় বিশেষ অধিবেশন ডেকে কলকাতা ও হাওড়ার ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন বিল পেশ করেছে রাজ্য সরকার। তা নিয়ে আলোচনায় বিগত তৃণমূল সরকারকে বিঁধলেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তাঁর অভিযোগ, হারবে জেনেই হাওড়ায় এতদিন ভোট করায়নি প্রাক্তন শাসকদল। পরে আলোচনায় যোগ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও বিঁধেছেন রাজ্যের প্রাক্তন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম (ববি) এবং তৃণমূল বিধায়ক জাভেদ খানকে। তাঁর কটাক্ষ, ‘ডিলিমিটেশন নিয়ে আপনাদের ধারণাই স্পষ্ট নয়।’
রাজ্য সরকারের পেশ করা ‘দ্য কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ এবং ‘দ্য হাওড়া মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন ( সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’— এই দুই বিলই পাশ হয়েছে। জোড়া বিল মারফত দুই পুর-আইনেরই ৫ নম্বর ধারায় দু’টি অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আইনের সংশ্লিষ্ট জায়গায় কলকাতার ক্ষেত্রে ১৪৪ জন নির্বাচিত পুর-প্রতিনিধির বদলে ২০৯ এবং হাওড়ার ক্ষেত্রে ৫০ পুর-প্রতিনিধির পরিবর্তে ৬৮ জনের কথা বলা হয়েছে সংশোধনী বিলে। এই দুই বিল পেশ করে অগ্নিমিত্রারা প্রাক্তন মন্ত্রী ফিরহাদ এবং অরূপ রায়কে বিঁধেছেন। ফিরহাদেরা তার জবাব দিয়েছেন। তা করতে গিয়ে এক সময়ে বিজেপির জিতেন্দ্র তিওয়ারির সঙ্গেও বিবাদে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
প্রাক্তন পুরমন্ত্রীর সেই বক্তব্য নিয়েই পরে তাঁকে বিঁধেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘আপনারা ডিলিমিটেশন নিয়ে যা বললেন, তাতে তো বোঝা যাচ্ছে যে, আপনাদের ধারণাই স্পষ্ট নয়। আজ যে বিল পেশ হয়েছে, সেটা ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানোর জন্য। এর পরে ওয়ার্ডের সীমানা, ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা, জনসংখ্যা ইত্যাদি নির্ধারণ করবে রাজ্য নির্বাচন কমিশন।’
শুভেন্দু জানিয়েছেন, এই দায়িত্বটা দেবে ভূমি দপ্তর এবং যাঁরা কলকাতা জেলার প্রশাসনের দায়িত্বে রয়েছেন। তার পরে তার একটা ড্রাফট নোটিফিকেশন হবে। তা নিয়ে আপত্তি-অভিযোগ জানানোর জন্য ন্যূনতম ৭ দিন সময় দেওয়া হবে। ১৫ দিনও দেওয়া যেতে পারে। দুটো সর্বদল বৈঠক ডাকতে হবে রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে। যার চেয়ারম্যান আইএএস কৃষ্ণা গুপ্তা। প্রথম ড্রাফট পাবলিকেশন আগের দিন সর্বদল বৈঠক ডাকা হবে। পরের বৈঠকটা হবে চূড়ান্ত পাবলিকেশনের আগে।
দুই বিল পেশ করে অগ্নিমিত্রা অভিযোগ করেন, ‘তৃণমূল জমানায় হাওড়ায় দুর্নীতি হয়েছে। পুকুর বুজিয়ে বৈআইনি নির্মাণ হয়েছে। নিকাশি ব্যবস্থা তথৈবচ। পানীয় জলটুকুও সব বাড়িতে পৌঁছয় না। আমরা রাস্তা-নিকাশি-জল নিয়ে বিশেষ প্ল্যান করছি। ১৫ বছর ধরে হাওড়ার মানুষ বঞ্চিত। জনসংখ্যার তারতম্যের কারণেই ওয়ার্ড বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস হলে নাগরিকরা সঠিক ভাবে পরিষেবা পাবেন। মানুষের ভোটে হারবেন বলে, এতদিন ভোটই করতে দেয়নি তৃণমূল। আর্থিক বরাদ্দ ২০০ কোটি টাকা হাওড়া বঞ্চিত। হাওড়া মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট অনুযায়ী, সংশোধনী বিল ২০২৬ নামে একটি বিল তৈরি হয়। প্রশাসনিক বৈষম্য ও পুর পরিষেবা সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে হাওড়ার ওয়ার্ড সংখ্যা ৫০ থেকে ৬৮টি বাড়ানো হবে।’
মধ্য হাওড়ার তৃণমূল বিধায়ক অরূপ রায়কেও বিঁধেছেন অগ্নিমিত্রা। তিনি বলেন, ‘অরূপবাবু, আপনারা করেননি কেন? জনসংখ্যা বাড়ছে। রাস্তা বড় করতে হবে, সময় পেয়েছেন ১৫ বছর, করেননি কেন? প্রাথমিক পরিষেবা থেকে হাওড়ার মানুষ বঞ্চিত হয়েছে।’
অগ্নিমিত্রার এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ফিরহাদ অভিযোগ করেন, অহেতুক বিগত সরকারকে দোষ দেওয়া হচ্ছে। পরিষেবার উন্নয়নের স্বার্থেই বালিকে হাওড়া পুরসভার অন্তর্গত করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই সময়ে জিতেনের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন ফিরহাদ। বলেন, ‘তোমায় বলতে হবে না, কোনটা বলতে পারব, কোনটা পারব না। ঠিকাদারি নিয়ে আপনারা কথা বলছেন, উমেশ বাবুকে দেখা গেল ঠিকাদারের সঙ্গে বৈঠক করতে। বৈঠক নিয়ে আপনার দলের কর্মী বিক্ষোভ দেখাল।’
তবে ফিরহাদ স্পষ্ট করে দেন, নীতিগত ভাবে ওয়ার্ড পুুনর্বিন্যাসের বিরোধিতা তিনি করছেন না। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটি ঠিক কোন নীতি বা মাপকাঠির ভিত্তিতে হচ্ছে, তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। ফিরহাদ বলেন, ‘এখানেও জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত করা উচিত ছিল। তাতে সাধারণ মানুষের সুবিধাই হতো।’