যুদ্ধ বা রোগেও এত মানুষ মরে না, যত মৃত্যু এ দেশে রাস্তায় বেরোলেই হয়। দেশে পথ দুর্ঘটনার বাড়বাড়ন্ত ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ফের উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরলেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গডকড়ি। তাঁর দাবি, ভারতে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে কমবেশি ২০ জন মানুষ পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। বছরে দেশে প্রায় ৫ লক্ষ পথ দুর্ঘটনা ঘটে, যার জেরে মৃত্যু হয় প্রায় ১.৮ লক্ষ মানুষের। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে গডকড়ির মন্তব্য, ‘যুদ্ধ কিংবা রোগেও এত বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয় না, যত ঘটে রাস্তার দুর্ঘটনায়।’
সোমবার নয়াদিল্লিতে আয়োজিত সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এক বিমা সংস্থা তাদের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেখানে সড়ক নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
গডকড়ি জানান, ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৫ লক্ষ পথ দুর্ঘটনা হয়। তার জেরে ১.৮ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২০ জন মানুষের প্রাণ যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় মৃতদের প্রায় ৬৬ শতাংশই তরুণ। দেশের কর্মক্ষম বয়সের মানুষের এত বড় সংখ্যায় মৃত্যু অর্থনীতি ও সমাজ—দুই ক্ষেত্রেই বড় ক্ষতি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সম্প্রতি সংসদেও গডকড়ি জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে ভারতে ৫.১৩ লক্ষেরও বেশি পথ দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ওই বছর দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ১.৮৩ লক্ষ মানুষের। অর্থাৎ ২০২৫ সালে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ২১ জনের মৃত্যু হয়েছিল পথ দুর্ঘটনায়।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হিসেবে হেলমেট না পরার বিষয়টিও তুলে ধরেন গডকড়ি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শুধু হেলমেট না পরার কারণে ৫৪,১৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আবার দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতদের প্রায় ৪৫ শতাংশই দু’চাকার গাড়ির চালক বা আরোহী। ফলে বাইক ও স্কুটার চালকদের ক্ষেত্রে হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব আরও এক বার সামনে এসেছে। গডকড়ির বক্তব্য, আইন করে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। ট্র্যাফিক আইন মেনে চলা, নির্ধারিত গতি বজায় রাখা, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার এবং দায়িত্বশীল ভাবে গাড়ি চালানোর মতো বিষয়গুলির উপর জোর দিয়েছেন তিনি।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গডকড়ি সরাসরি মানুষের আচরণকেই সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য, উন্নত রাস্তা তৈরি করা বা ট্র্যাফিক আইন কঠোর করাই যথেষ্ট নয়। যতক্ষণ না গাড়িচালক এবং সাধারণ মানুষের আচরণে পরিবর্তন আসছে, ততক্ষণ দুর্ঘটনা কমানো কঠিন।
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তাই পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি সচেতনতা এবং নিয়ম মেনে রাস্তায় চলার উপরে জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রী।
দুর্ঘটনা কমাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দুর্ঘটনাপ্রবণ রাস্তা বা ‘ব্ল্যাক স্পট’ চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানান গডকড়ি। এই জায়গাগুলিতে দুর্ঘটনা কমাতে পরিকাঠামোগত পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির জন্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের তরফে দেশের ১০০টি জেলা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে বেশি। এই জেলাগুলিতে দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট ভাবে পদক্ষেপ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ভারতের সড়ক পরিকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণের কথাও তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী। তাঁর দাবি, জাপানকে পিছনে ফেলে ভারত বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম সড়ক নেটওয়ার্কের দেশ। ভারতের আগে রয়েছে শুধু আমেরিকা ও চিন।
তবে একই সঙ্গে দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিসংখ্যান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন গডকড়ি। তাঁর বক্তব্য, বিপুল সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হলেও দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক আইন এবং নিরাপদে রাস্তা ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি হলে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে কেন্দ্র।
পথ দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু প্রাণহানিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতেও। গডকড়ির বক্তব্য অনুযায়ী, পথ দুর্ঘটনার কারণে প্রতি বছর ভারতের জিডিপি-র প্রায় ৩ শতাংশ ক্ষতি হয়। কারণ, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার পাশাপাশি তাঁর চিকিৎসার খরচ, কর্মক্ষমতা হারানোর মতো ঘটনা, যানবাহনের ক্ষতি এবং অন্যান্য আর্থিক ক্ষতির বোঝাও দেশের অর্থনীতির উপর চাপে। যার প্রভাব পড়ে GDP-র উপরে। তাই পরিকাঠামো উন্নয়ন, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সাধারণ মানুষের আচরণে পরিবর্তন—এই তিনটি দিক একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াকেই সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখছেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গডকড়ি।