• গ্যালারিতে ফাটল, চেয়ারে ধুলো! কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম আঁধারেই, দীর্ঘশ্বাস ক্রীড়ামহলে
    এই সময় | ১১ আগস্ট ২০২৬
  • মিঠুন ভট্টাচার্য, শিলিগুড়ি

    সালটা ২০১৭। দিনটা ২৪ সেপ্টেম্বর। শেষবারের মতো এই মাঠে ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান ডার্বি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল। তার পরে ন'টা বসন্ত পেরিয়েছে। বাংলার দুই প্রধান ফুটবল শক্তি, বাংলারই উত্তরাংশে সবচেয়ে বড় মাঠ শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে আর মুখোমুখি হতে পারেনি। ইস্ট-মোহনের ম্যাচ হবে কেমন করে? এই মাঠে ডার্বির মতো ম্যাচ আয়োজনের পরিকাঠামোই নেই। না-হলে গতবছরই গঙ্গাসাগর মেলার কারণে আইএসএলের ডার্বি কলকাতা থেকে গুয়াহাটিতে সরিয়ে নিয়ে যেতে হতো না।

    শিলিগুড়ির ক্রীড়াপ্রেমীদের আক্ষেপ ছিল, আর একটু নজর দিলে আইএসএলের ডার্বি বাংলার বাইরে যেত না। এক সময়ে এই মাঠেই ফেডারেশন কাপের ম্যাচ হয়েছে। আশির দশকে এখানেই আয়োজিত হয়েছিল নেহেরু কাপের ম্যাচ। নামি-দামী বিদেশি ফুটবলাররাও এই মাঠের প্রশংসা করে গিয়েছিলেন। অথচ বর্তমানে উত্তরবঙ্গবাসীর কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়াম শুধুই দীর্ঘশ্বাসের কারণ!

    এখন স্টেডিয়াম চত্বরে গেলেই ক্রীড়াপ্রেমীদের চোখে জল আসে। মাঠের ২, ১৪-সহ বিভিন্ন গেটের আশপাশের দেওয়ালে ফাটল স্পষ্ট। ফোসিন গেট দিয়ে মহকুমা ক্রীড়া পরিষদের অফিসঘরের দিকে তাকালেই চোখে পড়বে ভাঙাচোরা গ্যালারি। সর্বত্র রং চটে ধূসর হয়ে গিয়েছে। শেষবার স্টেডিয়ামে কবে রং হয়েছিল, মনে করতে পারছে না শহরের ক্রীড়ামহল। গেট দিয়ে ঢুকতেই বিবর্ণ ঘাস জানান দেয় মাঠের পরিচর্যার অভাব আসলে কতটা। নামেই ভিআইপি গ্যালারি, সেখানে প্লাস্টিকের চেয়ারগুলোতে ধুলো জমেছে। একটু চাপ দিলে ভেঙেও যেতে পারে। গোটা মাঠে ফেন্সিং বলে কিছু নেই। ডাগ আউটও অবহেলায় পড়ে রয়েছে।

    এক সময়ে যেখানে টিকিট কাটার জন্য লাইন পড়ে যেত, সেই কাউন্টারগুলিতে বর্তমানে আবর্জনার স্তূপ। ভাঙাচোরা ড্রেসিংরুম। পানীয় জলের কলগুলিও ভাঙা। এই অব্যবস্থার মধ্যেই এখানে সারাবছর লিগ পর্যায়ের ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ফার্স্ট ডিভিশন এবং সুপার ডিভিশনে খেলতে আসা ফুটবলাররা বারবার সমস্যায় পড়েন। সন্ধ্যায় বা রাতে ম্যাচ আয়োজনের জন্য ফ্লাডলাইট থাকলেও আলাদা করে বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। জেনারেটরের সাহায্যে আলোকিত হয় স্টেডিয়াম।

    আশির দশকে স্টেডিয়ামটি তৈরির পরে প্রশাসনিক আধিকারিকদের নিয়ে একটি কমিটি বানানো হয়েছিল। তার পরে মহানন্দা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। সেই কমিটির আর কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। বছর সাতেক আগে স্টেডিয়ামটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজ্যের ক্রীড়া দপ্তরকে। সেই সময়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে মাঠ সংস্কারের কথা বলা হলেও কার্যত কিছুই হয়নি বলে অভিযোগ। বছর দুয়েক আগে তৎকালীন রাজ্য সরকার স্টেডিয়ামটি সংস্কারের দায়িত্ব দেয় শিলিগুড়ি পুরসভাকে। এক দিকের কাজের জন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দও করা হয় বলে খবর। সংস্কার শুরু হয়। কিন্তু কিছুদিন যেতেই কাজ থমকে যায়। এরই মাঝে রাজ্যে পালাবদল ঘটে। এখনও পর্যন্ত স্টেডিয়াম সংস্কারের কোনও উদ্যোগ দেখা যায়নি।

    বিষয়টি নিয়ে পুরসভার এক আধিকারিক বলেছেন, 'আমাদের কাছে এখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনও অর্ডার আসেনি। নির্দেশ মতোই কাজ হবে। তবে সম্ভবত স্টেডিয়ামটির দায়িত্ব পুরসভার কাছ থেকে পুনরায় রাজ্যের ক্রীড়া দপ্তরের হাতে চলে যেতে পারে।' শিলিগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গের গর্ব এই স্টেডিয়ামের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন খোদ শিলিগুড়ির বিধায়ক এবং পর্যটন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ। তাঁর কথায়, 'বিষয়টি নিয়ে ক্রীড়া মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। স্টেডিয়াম নিয়ে রাজ্য সরকারের একাধিক পদক্ষেপের চিন্তাভাবনা রয়েছে বলেই জানি।' রাজ্যের ক্রীড়া মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ-ও স্টেডিয়ামের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের আশ্বাস দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি শিলিগুড়িতে এসে স্টেডিয়াম পরিদর্শন করে বলেন, 'মাঠটিকে এতদিন অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছিল। আমরা এটিকে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামে পরিণত করব। সেইমতো পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে।'

  • Link to this news (এই সময়)