নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ নিয়ে ঝাড়খণ্ডে জেন জ়ি পড়ুয়াদের আন্দোলনে উত্তেজনার পারদ আরও চড়ল। সরকারের সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক হলেও কাটেনি অচলাবস্থা। রাজ্য সরকার পড়ুয়াদের ৯৮ শতাংশ দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করলেও সেই বক্তব্য সরাসরি খারিজ করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, মোট ১৩টি পরীক্ষা বাতিলের দাবি জানানো হলেও সরকার মাত্র তিনটি পরীক্ষা বাতিল করতে রাজি হয়েছে। তাই সোমবার, ১০ অগস্ট বিধানসভা অভিযানের ডাক দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
রাঁচিতে এই আন্দোলন সোমবার ১৭তম দিনে পড়েছে। নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা, অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে টানা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন JPSC ও JSSC-র চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, অভিযোগের তদন্তে CBI-কে দায়িত্ব দেওয়া এবং বিতর্কিত JSSC CGL পরীক্ষা বাতিল করা। কিন্তু এই দুই দাবিই এখনও মেনে নেয়নি হেমন্ত সোরেন সরকার। ফলে সরকারের ‘৯৮ শতাংশ দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে’—এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীরা।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁদের দাবি শুধু কয়েকটি পরীক্ষা বাতিল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পরীক্ষার অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের অভিযোগ না ওঠে, তার জন্য JPSC ও JSSC-তে কাঠামোগত সংস্কারের দাবিও রয়েছে।
আন্দোলনকারীরা JPSC ও JSSC-র নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে ১৪তম JPSC সিভিল সার্ভিস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর থেকেই অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বাড়ে। ৫ জুলাই ফল প্রকাশের পর পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আন্দোলনে নামেন চাকরিপ্রার্থীরা।
রবিবার সরকারের সঙ্গে ফের আলোচনা হলেও কোনও সমাধানসূত্র বেরোয়নি। দুই পক্ষই একে অপরকে সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট আন্তরিক না হওয়ার অভিযোগ করেছে। এর পরেই আন্দোলনকারীরা জানিয়ে দেন, সোমবারের বিধানসভা অভিযান কোনওভাবেই বাতিল করা হবে না।
ছাত্রনেতা সঞ্জয় মেহতার বক্তব্য, তিন দফা আলোচনার পরও তাঁদের সব দাবি মেনে নেওয়া হয়নি। তাঁদের দাবি, JSSC CGL পরীক্ষা বাতিল করতে হবে, অনিয়মের অভিযোগে CBI তদন্ত করতে হবে, পড়ুয়াদের প্রস্তাবিত পরীক্ষা সংস্কার মডেল গ্রহণ করতে হবে এবং তাঁদের প্রস্তাবিত নিয়োগ ক্যালেন্ডার অবিলম্বে চালু করতে হবে।
আন্দোলনকারীরা জানিয়েছে, সোমবার পুরোনো বিধানসভা ভবন চত্বর থেকে নতুন বিধানসভা ভবনের দিকে মিছিল যাবে। আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ রাখার জন্য পড়ুয়াদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে না জড়ানো, যান চলাচলে সমস্যা তৈরি না করা এবং গুজব এড়িয়ে চলার আবেদনও করা হয়েছে।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো। তিনি পড়ুয়াদের দাবি পূরণে অনশনে বসেছিলেন। সোমবারের বিধানসভা অভিযানে রাজ্যের পড়ুয়া ও অভিভাবকদের যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মাহাতোর দাবি, প্রতিটি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠছে। এর ফলে যোগ্য পড়ুয়ারা চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি জানিয়েছেন, আট দিন অনশনের ফলে তাঁর প্রায় ১০ কেজি ওজন কমেছে, রক্তে শর্করার মাত্রাও কমেছে এবং তিনি শারীরিক ভাবে যথেষ্ট দুর্বল। তবে তাঁর কথায়, এই শারীরিক কষ্টের থেকেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে পড়ুয়াদের চাকরি না পাওয়ার যন্ত্রণা বেশি।
সোমবারকে আন্দোলনের ‘নির্ণায়ক দিন’ হিসেবে উল্লেখ করে মাহাতো পড়ুয়াদের সকাল সাড়ে ১০টায় পুরোনো বিধানসভা ময়দানে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দরিদ্র, কৃষক, শ্রমজীবী ও গ্রামীণ পরিবারের সন্তানরা যাতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চাকরি পান, সেটাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
অন্যদিকে, হেমন্ত সোরেনের নেতৃত্বাধীন JMM সরকার বলছে, পড়ুয়াদের অধিকাংশ দাবিই মেনে নেওয়া হয়েছে। সরকারের তরফে আন্দোলন প্রত্যাহার করে আলোচনার মাধ্যমে বাকি বিষয়গুলি সমাধানের আবেদন জানানো হয়েছে।
উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা মন্ত্রী সুদিব্য কুমার জানিয়েছেন, পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত কোনও ব্যক্তিকে আড়াল করার প্রশ্নই নেই। সরকারের দাবি, ১৪তম JPSC পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, JPSC পরীক্ষায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেট (Enforcement Directorate) বা ED তদন্তভার হাতে নিয়েছে।
সরকার আরও জানিয়েছে, পরীক্ষায় অনিয়ম সংক্রান্ত মামলায় দ্রুত চার্জশিট পেশের জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক ব্যবস্থা করা হবে। সেই ব্যবস্থায় ৯০ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা দেওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
নিয়োগ পরীক্ষার পদ্ধতিতে সংস্কারের জন্য IIT-ISM ধানবাদ, IIM রাঁচি এবং XLRI জামশেদপুরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। এ ছাড়াও JSSC CGL পরীক্ষা নিয়ে পর্যালোচনার জন্য অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের নিয়োগ পরীক্ষায় আরও স্বচ্ছতা আনতে পড়ুয়াদের পরামর্শ নেওয়ার জন্য একটি পোর্টাল চালু করা হয়েছে। সেই পরামর্শের ভিত্তিতে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য SOP তৈরির কথাও জানিয়েছে সরকার। কিন্তু সরকারের এই প্রস্তাব আন্দোলনকারীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কারণ তাঁদের অন্যতম প্রধান দাবি হল, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত CBI-কে দিয়ে করানো।
বিশেষ করে JSSC CGL পরীক্ষা বাতিল এবং CBI তদন্তের দাবিকে কেন্দ্র করেই দুই পক্ষের মধ্যে মূল বিরোধ তৈরি হয়েছে। সরকার CBI তদন্তের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের যুক্তি, ওই পরীক্ষা হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে পরিচালিত হয়েছিল। তাই নতুন করে CBI তদন্তের প্রয়োজন নেই বলে দাবি রাজ্যের। এদিকে ১০ অগস্টের বিধানসভা অভিযানকে কেন্দ্র করে রাঁচিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে মিছিল শান্তিপূর্ণ রাখার কথা বলা হলেও বিপুল সংখ্যক পড়ুয়ার জমায়েত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।