ভালো তৃণমূল বলে আবার কিছু হয় নাকি! কষ্ট চেপে দেশের স্বার্থে ‘তোতাপাখি’ খড়্গপুরের বিজেপি নেতা ও কর্মীরা
বর্তমান | ০৮ আগস্ট ২০২৬
মণিরাজ ঘোষ, খড়্গপুর: ‘ভারতীয় জনতা পার্টি মানেই তৃণমূল!’ ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে বোলপুরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই মন্তব্য করেছিলেন মুকুল রায়। তাঁর সেই বেফাঁস মন্তব্য যে খুব একটা ভুল ছিল না, এতদিন পর তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন নিষ্ঠাবান বিজেপি ও তৃণমূল কর্মীরা। ভোটের ফল বেরোনোর মাত্র তিন মাসের মধ্যেই দল বাড়াতে ‘ভালো তৃণমূল’ শব্ধবন্ধ আবিষ্কার করল বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব। ধীরে ধীরে সুকৌশলে তাদের কাছে টানতেও শুরু করেছে। ডিম থেরাপি কিংবা জেল-যাত্রার হাত থেকেও বেছে বেছে রেহাই দেওয়া হচ্ছে তাঁদের। এসব জেনেবুঝেও বাধ্য হয়েই এখন শীর্ষ নেতৃত্বের শেখানো বুলি আওড়াচ্ছেন মেদিনীপুর-খড়্গপুরের বিজেপি নেতারা। তবে, ‘তোতাপাখি’ হলেও আক্ষেপ চেপে রাখতে পারছেন না তাঁরা।
খড়্গপুর পুরসভার কাউন্সিলার তথা জেলা বিজেপির সহ-সভাপতি অভিষেক আগরওয়াল বলেন, ‘কষ্ট তো হচ্ছেই। কিন্তু কি আর করা যাবে! আমরা দলের শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈনিক। আমাদের কাছে ব্যক্তির আগে দল। দলের আগে দেশ। দেশের স্বার্থেই তৃণমূলের সাংসদদের নেওয়া হচ্ছে বলে আমাদের রাজ্য সভাপতি শমীকবাবু জানিয়ে দিয়েছেন। আমরাও দলের নিচুতলার কর্মীদের সেটাই বোঝাচ্ছি।’
ভোটের ফল বেরোনোর ঠিক আগের দিনই তৃণমূলের কাউন্টিং এজেন্টদের নিয়ে বৈঠক করেছিলেন মেদিনীপুরের সাংসদ জুন মালিয়া। সেখানে তিনি ডিজে বাজানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। সেই সংক্রান্ত একটি ভিডিও (যাচাই করেনি বর্তমান) পোস্ট করে জুনকে কড়া নিশানা করেছিলেন বিজেপির জেলা মুখপাত্র অরূপ। সেই জুনই এখন এনডিএ’র নয়া শরিক এনসিপিআইয়ের সাংসদ হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করছেন। তাঁদের সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তুলে পোস্ট করছেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই ছবি ভাইরাল হচ্ছে নেট দুনিয়ায়। যা দেখে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছেন মেদিনীপুর, খড়্গপুর, শালবনীর বিজেপি কর্মীরা। শুধু তাই নয়, আগামীদিনে সাংসদ জুন মালিয়ার হাত ধরে তাঁর অনুগামীরাও যে বিজেপির ওয়াশিং মেশিনে প্রবেশ করবেন, তাও মানছেন ওই কর্মীরা। ইতিমধ্যেই ঋতব্রত-তৃণমূলের জেলার দুই বিধায়ক দীনেন রায়, শিউলি সাহা, জেলা সভাপতি প্রদীপ সরকার, নির্মল ঘোষরা সেই লাইনে রয়েছেন বলে জল্পনা। এনিয়ে অনেক বিজেপি নেতা-কর্মীই সমাজমাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। আবার অনেকেই শীর্ষ নেতৃত্বের ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন।
তবে, অকপট জেলা বিজেপির মুখপাত্র অরূপ দাস। শুক্রবার তিনি বলেন, ‘তৃণমূলের আবার ভালো? সোনার যেমন পাথরবাটি হয় না, এটাও সম্ভব নয়। বহু বিজেপি কর্মীর বলিদান ও আত্মত্যাগের বিনিময়েই আমাদের দল ক্ষমতায় এসেছে। আমরা তৃণমূলের অত্যাচার, হুমকি, নির্যাতনের কথা ভুলিনি। তবে, দেশের স্বার্থ আর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশ মাথায় রেখে অনেক কিছুই মেনে নিতে হচ্ছে। তবুও বলছি, বিজেপির তৃণমূলীকরণ হবে না।’
বিজেপির এমন অবস্থান নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়ছে না বিরোধী কংগ্রেস ও সিপিএম। সিপিএমের জেলা সম্পাদক বিজয় পালের মন্তব্য—‘এক বৃন্তে দুটি কুসুম। যাহাই বিজেপি, তাহাই তৃণমূল!’ জেলার এক কংগ্রেস নেতাও বলছেন, ‘বিজেপি আর তৃণমূলের কোনো তফাৎ নেই। দেশের দোহাই দিয়ে এখন দলীয় কর্মীদের মগজ ধোলাই করছে গেরুয়া শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্ব।’