• বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বতের ‘ফতোয়া’, বন্ধ ১২টি ব্লাড ব্যাংকের শিবির, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কয়েকশো শিশুর জীবন সংকটে!
    বর্তমান | ০৭ আগস্ট ২০২৬
  • বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: উপহারের বিনিময়ে রক্তদান, রাজ্য রক্ত সঞ্চালন পর্ষদকে না জানিয়ে ভিন রাজ্যে রক্ত বিক্রি সহ একাধিক অভিযোগে নড়েচড়ে বসেছে নয়া সরকার। এ পর্যন্ত ১২টি বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকের (আদর্শ নাম ‘ব্লাড সেন্টার’) বাইরের রক্তদান শিবির বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তর। প্রায় রোজই কোনো না কোনো প্রাইভেট ব্লাড ব্যাংকে অভিযান চলছে। সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডঃ শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের ‘বাইট’ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সম্প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু, এইসব প্রাইভেট ব্লাড ব্যাংকগুলির উপর যে কয়েকশো থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু ও কিশোরের জীবন-মৃত্যু নির্ভরশীল, সে ব্যাপারে রা কাড়ছে না প্রশাসন। সারা বছর পাড়া, এলাকার ক্লাব বা সংগঠন রক্তদান শিবিরের আয়োজন করে। আর সেই রক্ত সংগ্রহ করে বিভিন্ন প্রাইভেট ব্লাড ব্যাংকের হাতে তুলে দেয় এমন সন্তানদের বাবা-মায়েরা। বিনিময়ে তাদের সন্তানদের প্রয়োজনে রক্ত নিখরচায় বা কম খরচে বছরভর পাওয়া নিশ্চিত থাকে। চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হল, বর্তমান পরিস্থিতিতে বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকগুলির উপর নির্ভরশীল থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু-কিশোরদের জীবন যাতে সংকটে না পড়ে, সেজন্য আগাম প্রস্তুতিই নেননি স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বতবাবু এবং স্বাস্থ্যদপ্তরের ব্লাড সেফটি শাখা। করা হয়নি বিকল্প কোনো ব্যবস্থাও। প্রতিটি প্রাইভেট ব্লাড ব্যাংকে তালিকা থাকে—সেখানে কোন থ্যালাসেমিয়া রোগী রক্ত নেয়, কী তাদের ব্লাড গ্রুপ, বাড়ি কোথায়। বাইরের রক্তদান শিবির বন্ধ করার আগে প্রাইভেট থেকে তালিকা সংগ্রহ করে এইসব রোগীর জন্য জেলাস্তর এবং কলকাতায় বাড়ির কাছে সুষ্ঠুভাবে রক্ত পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়নি। এমন মারাত্মক অভিযোগ উঠছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রক্তদান আন্দোলনের একাধিক কর্মী বলছেন, ‘যে সময়টুকু নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আত্মপ্রচারে ব্যয় করছেন, তার সামান্যতম অংশ যদি থ্যালাসেমিয়া এবং অন্যান্য রক্তের অসুখে আক্রান্ত রোগীদের সুষ্ঠুভাবে রক্ত সরবরাহ পাওয়া সুনিশ্চিত করতে ব্যয় করতেন, প্রচুর আশীর্বাদ পেতেন।’ 

    শহরে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবক মহলের দু’টি অন্যতম সংস্থা হল, উত্তর কলকাতার থ্যালাসেমিক গার্ডিয়ানস অ্যাসোসিয়েশন এবং দক্ষিণ কলকাতার দ্য থ্যালাসেমিয়া সোসাইটি অব ইন্ডিয়া। প্রথমটির অন্যতম কর্মকর্তা জয়ন্ত সোম বলেন, ‘ছেলের যখন ছয় মাস, তখন থেকে লড়াই শুরু। এখন ১৬ বছর। মাসে ৩ ইউনিট রক্ত লাগবেই। ফেনোটাইপ ম্যাচিং করে সেই রক্ত দিতে হয়। প্রাইভেট ব্লাড ব্যাংক অনিয়ম করেছে, সরকার তদন্ত করছে, ভালো করছে। কিন্তু এইসব জায়গা থেকে তো আমাদের বাচ্চারা রক্ত পায়। তার বিকল্প ব্যবস্থা তো করতে হবে? আমাদের সংগঠনের সঙ্গে প্রায় দেড়শো থ্যালাসেমিয়া শিশু এবং বাড়ির লোকজন যুক্ত। ৮০ শতাংশ এমন রোগী যে প্রাইভেট ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত পায়, তার রক্তদান শিবির করার এক্তিয়ার কেড়েছে সরকার। যা স্টক আছে, শনিবার পর্যন্ত রক্ত চলবে। তারপর? সরকারের কাছে একটাই আবেদন, আমাদের বাচ্চারা অভিশাপ, এমনটা ভাববেন না।’ জয়ন্তবাবু বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের বাঁচাতে প্রয়োজনে সমস্ত থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু এবং তাদের বাবা-মায়েরা রাস্তায় নামব। মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দেব।’ সংগঠন সূত্রের খবর, শেষ তিন মাসেই তাদের সন্তানদের ৪০০ ইউনিট  রক্ত লেগেছিল। গত বছর দরকার পড়েছিল ২ হাজার ইউনিট। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাশে দাঁড়াতে স্বাস্থ্যদপ্তর থেকে কোনো ফোন পাননি বলে জানান জয়ন্তবাবু। রক্তদান আন্দোলনের কয়েক দশকের কর্মী ডি আশিস বললেন, ‘চারদিক থেকে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত সন্তানদের পরিবারের ফোন পাচ্ছি। ওদের ফেনোটাইপ রক্ত, অ্যান্টিবডি পেতে যাতে অসুবিধা না হয়, নিশ্চিত করুক সরকার।’ বেহালার বাসিন্দা জয়ন্ত সরকার বললেন, ‘ছেলে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত। খুব টেনশনে আছি। কারণ, যে কোনো সরকারি ব্লাড ব্যাংকে গেলাম আর বললাম, রক্ত দিন... এভাবে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসা হয় না। আনুষঙ্গিক বহু বিষয় লাগে।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বতবাবু বলেন, ‘এইসব অপপ্রচার। কিছু এনজিও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করছে। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের জন্য মানিকতলা সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাংকে আলাদা ইউনিট আছে। সেখানে যান। কারও কোনো সমস্যা হবে না।’
  • Link to this news (বর্তমান)