পেশায় নিরাপত্তারক্ষী, নেশা রবীন্দ্রসঙ্গীত! শান্তিনিকেতনের একদা ‘মাস্টারমশাই’য়ের গান এখন ভাইরাল
প্রতিদিন | ০৭ আগস্ট ২০২৬
পেট চালাতে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ, কিন্তু হৃদয়ে আজও রবীন্দ্রনাথ। সংসারের অভাব ঘোচাতে পারেনি রবীন্দ্রসঙ্গীত। একপ্রকার দিনের কর্মজীবনে নিরাপত্তারক্ষী। আর অবসরে তিনি রবীন্দ্রনাথের গানে একনিষ্ঠ ভক্ত। অভাবের সংসার, জীবনের নানা টানাপোড়েন, এমনকি পেশা বদলের বাধ্যবাধকতাও থামাতে পারেনি তাঁর রবীন্দ্রচর্চা। শান্তিনিকেতনের গুরুপল্লির বাসিন্দা, বিশ্বভারতীর সঙ্গীত ভবনের প্রাক্তনী শোভন চক্রবর্তী আজও রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গী করেই জীবনযাপন করছেন। তাঁর কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুধু গান নয়, বেঁচে থাকার অবলম্বন। যাকে বলে ‘প্রাণের আরাম’। নিজের সঙ্গীতশিক্ষা মাঝপথে থমকে গেলেও শোভন এখন বহু ছাত্রছাত্রীর গানের ‘মাস্টারমশাই’।
মাত্র আড়াই বছর বয়সে মা পুতুল চক্রবর্তীর হাত ধরে গানের জগতে পা রাখা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শান্তিনিকেতনের সঙ্গীত ভবনে রবীন্দ্র গানের তালিম নেন বেশ কিছুদিন। কিন্তু সংসারের অভাব-অনটন আর আর্থিক টানাপোড়েনে মাঝপথেই থামাতে হয় সেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। কিন্তু সাধনার স্রোত ছিল অবিরত। বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানই তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী। একসময় শোভনের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখতে আসতেন বহু ছাত্রছাত্রী। ছোট ছোট কচিকাঁচাদের গান শেখানোর মধ্যেই খুঁজে নিতেন নিজের আনন্দ। তাঁর কণ্ঠে গান শুনলে অনেক সময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষটির মনে হতে পারে, কোথাও যেন রেকর্ড বাজছে। এমনই নিখুঁত তাঁর সুর, এমনই নিবিড় তাঁর রবীন্দ্রচর্চা। শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন মহল্লায় তাঁর সুরের জাদুতে আজও মুগ্ধ হন ছোট-বড় অনেকেই।
কিন্তু করোনা মহামারীর পর বদলে যায় সেই পরিচিত ছবি। একের পর এক কমতে থাকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখানো থেকে নিয়মিত আয়ও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। সংসার চালানোর তাগিদে বাধ্য হয়েই বেছে নিতে হয় বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীর কাজ। পেশা বদলালেও বদলায়নি তাঁর পরিচয়। দিনের শেষে নিরাপত্তারক্ষীর পোশাক খুলে আবার ফিরে আসেন সেই চেনা জগতে – রবীন্দ্রনাথের গানে। তবে অর্থাভাবে কারও কাছে হাত পাততে নারাজ শোভন।
অর্থসাহায্য নয়, তাঁর একমাত্র চাওয়া রবীন্দ্রসংস্কৃতির পরিসর আরও বিস্তৃত হোক। কেউ তাঁর কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখে উপকৃত হন তাহলে নিজের শ্রমের যথাযথ পারিশ্রমিক নিতে আপত্তি নেই। নিছকই সাহায্যের নামে অর্থ গ্রহণে অনীহা তাঁর। শোভন চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গী করেই শান্তিনিকেতনে রয়েছি। তাঁর গানই আমার সঙ্গী। নিরাপত্তারক্ষীর কাজের পাশাপাশি কেউ গান শুনলে বা শিখতে চাইলে সানন্দে গ্রহণ করব। রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার জীবনে সুখ এবং পরম প্রাপ্তি।” শান্তিনিকেতনের মাটিতে এমন মানুষই হয়তো মনে করিয়ে দেয় জীবিকার প্রয়োজনে নিরাপত্তারক্ষীর পোশাক পরলেও তাঁর হৃদয়ে আজও বেজে চলে রবীন্দ্রনাথের গান। সুর থামাতে পারেনি, বরং আরও দৃঢ় করেছে সাধনা।